গার্দিওলার ছায়া পেরিয়ে আর্তেতার উত্থান

দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন পেপ গার্দিওলার ছায়ায়। শিষ্য, সহকারী, অনুসারী, নানা পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন মিকেল আর্তেতা। কিন্তু ২০২৬ মৌসুমে আর্সেনালকে ২২ বছর পর ইংল্যান্ডের শিরোপা জিতিয়ে অবশেষে নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুললেন স্প্যানিশ এই কোচ। এখন আর তিনি শুধু গার্দিওলার ছাত্র নন, বরং তার সমকক্ষ হিসেবেই আলোচনায়।

টানা তিন মৌসুম রানার্সআপ হওয়ার হতাশা পেছনে ফেলে এবার প্রিমিয়ার লিগের মুকুট জিতেছে আর্সেনাল। অনেকেই বলবেন, এই সাফল্য অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। কেউ কেউ হয়তো আর্সেনালের খেলার ধরন নিয়েও সমালোচনা করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লাবের আর্তেতার ওপর রাখা আস্থা সফল হয়েছে।

গার্দিওলার দলে কাজ করার সময় খুব কাছ থেকে দেখেছেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা মস্তিষ্ককে। ম্যানচেস্টার সিটিতে তিন বছর সহকারী কোচ হিসেবে থাকার পর চাইলে গার্দিওলার কৌশল হুবহু অনুসরণ করতে পারতেন আর্তেতা। কিন্তু তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা দর্শন।

আর্তেতার আর্সেনাল গড়ে উঠেছে জোনাল নিয়ন্ত্রণ, তীব্র প্রেসিং, শক্ত রক্ষণ এবং কঠোর দলীয় শৃঙ্খলার ওপর। পাশাপাশি একসময় ‘নরম’ দল হিসেবে পরিচিত আর্সেনালকে তিনি রূপ দিয়েছেন বাস্তববাদী ও লড়াকু দলে, যারা সুন্দর খেলতেও পারে, আবার প্রয়োজনে কুৎসিতভাবেও জিততে জানে।

বিশেষ করে সেট-পিস থেকে আর্সেনালের সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২১ সালে নিকোলাস জোভারকে সেট-পিস কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল আর্তেতার অন্যতম সেরা পদক্ষেপ।

এই মৌসুমে কর্নার থেকে সর্বোচ্চ গোলের প্রিমিয়ার লিগ রেকর্ড গড়েছে আর্সেনাল। বার্নলির বিপক্ষে কাই হাভার্টজের গোলটি ছিল কর্নার থেকে তাদের ১৮তম গোল। দলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি গোল এসেছে ডেড-বল পরিস্থিতি থেকে। আর ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছে আটটি ম্যাচে।

কেউ কেউ তাই আর্সেনালকে “সবচেয়ে কুৎসিত” চ্যাম্পিয়ন বলেও কটাক্ষ করেছেন। তবে আর্তেতা বা আর্সেনাল সমর্থকদের কাছে তাতে কিছু যায় আসে না।

আর্তেতার সাবেক কোচ ডেভিড ময়েসও বলেছেন, ‘জেতার জন্য আপনাকে নানা পথ খুঁজে বের করতেই হবে। আপনি যত ভালো ফুটবলই খেলুন না কেন, শেষ পর্যন্ত জয়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

২০১৯ সালে উনাই এমেরির জায়গায় দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্তেতার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রথম মৌসুমেই এফএ কাপ জিতলেও লিগে আর্সেনাল শেষ করেছিল অষ্টম স্থানে। পরের মৌসুমেও একই অবস্থান হলে ২৫ বছর পর ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যায় ক্লাবটি।

২০২১-২২ মৌসুমে প্রথম তিন ম্যাচেই গোল না করে হার, যার মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ৫-০ গোলের বিধ্বংসী পরাজয়, সব মিলিয়ে তীব্র চাপে পড়ে যান আর্তেতা। সেই সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন গার্দিওলা।

‘সে শুধু ভালো কোচ নয়, অসাধারণ কোচ। তাকে বিশ্বাস করুন, সে সফল হবে,’ বলেছিলেন সিটি বস। সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন আর্তেতা। ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছেন আর্সেনালের পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং সমর্থকদের সঙ্গে দলের সম্পর্কও।

এমিরেটস স্টেডিয়ামের পরিবেশ বদলে দিতে সমর্থকদের সম্পৃক্ত করাকে বড় লক্ষ্য করেছিলেন তিনি। ম্যাচের আগে ‘নর্থ লন্ডন ফরএভার’ গানটিকে ক্লাবের আবেগে পরিণত করার পেছনেও ছিল তার ভূমিকা।

২০২২-২৩ মৌসুমে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল আর্সেনাল। পরের মৌসুমেও শেষ দিন পর্যন্ত ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে লড়াই করে হার মানতে হয়। তবে এবার আর ভুল করেনি তারা।

এবেরেচি এজে, ভিক্টর গিওকারেস ও মার্টিন সুবিমেন্দির মতো খেলোয়াড়দের যোগ হওয়া ছিল শেষ ইট, কিন্তু ভিতটা অনেক আগেই তৈরি করেছিলেন আর্তেতা।

 

Related Articles

Latest Posts