কিছু কণ্ঠ সময়ের সীমা অতিক্রম করে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে, সংগীতের ভাষা ও প্রযুক্তি পাল্টে যায়, তবু সেই কণ্ঠের আবেদন ফুরোয় না। আশা ভোঁসলে তেমনই এক নাম। ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতভুবনে তার কণ্ঠ যেন এক দীর্ঘ, বর্ণময় যাত্রার নাম, যেখানে প্রেম আছে, উচ্ছ্বাস আছে, বিরহ আছে, বিষাদ আছে; আর আছে জীবনের নানা অনুভূতির বিচিত্র অনুরণন।
আজ এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পীর জন্মদিন। তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের দিকে ফিরে তাকালে বিস্মিত হতে হয় গানের বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি দেখে। অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে তিনি কেবল শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেননি, ভারতীয় চলচ্চিত্র গানের ইতিহাসেও নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক অনন্য অধ্যায়।
আশা ভোঁসলেকে কোনো একটি গানের ধরন কিংবা নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মধ্যে আটকে রাখা কঠিন। কখনো তিনি গেয়েছেন প্রেমের গান, কখনো নাচের তালে মাতিয়েছেন শ্রোতাকে। কখনো গজলের মায়াবী আবহে ডুবিয়েছেন, আবার কখনো শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরে নিয়ে গেছেন শ্রোতাদের।
তার কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি ছিল তারুণ্যের দীপ্তি। বয়স বেড়েছে, সময় বদলেছে, সংগীতের প্রযুক্তি বদলে গেছে; কিন্তু তার কণ্ঠের প্রাণ হারিয়ে যায়নি। তার গান শুনতে শুনতেই বড় হয়েছে একাধিক প্রজন্ম। শ্রোতার রুচি বদলেছে, সংগীতের ধরন বদলেছে, নতুন নতুন শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে, তবু আশা ভোঁসলের গান কখনো পুরোনো হয়ে যায়নি।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে। মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি চলচ্চিত্রে তার প্রথম গান রেকর্ড হয়। সংগীতজীবনের শুরুতে মূলত নাচের গান ও হালকা ধরনের গানের জন্য পরিচিতি পেলেও ধীরে ধীরে তিনি নিজের পরিসর বিস্তৃত করেন। গজল থেকে ধ্রুপদী সংগীত; বিভিন্ন ধারায় তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ এনে দেয় অসামান্য জনপ্রিয়তা ও স্বীকৃতি।
আজ তার জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে নতুন একটি গান, ‘এ মেরি জিন্দেগি, তু ছুপি হ্যায় কাহাঁ’। গানটি ২০১৩ সালের শেষ দিকে রেকর্ড করা হয়েছিল হরীশ ব্যাস পরিচালিত একটি সিনেমার জন্য। দীর্ঘ সময় পর গানটির প্রকাশ যেন তার কণ্ঠের সেই চিরসবুজ আবেদনকেই আবার সামনে নিয়ে আসে।
আশা ভোঁসলের জনপ্রিয় হিন্দি গানের তালিকা এত দীর্ঘ যে তা দিয়ে অনায়াসে একটি সংগীতের ইতিহাস লেখা যায়। তার কণ্ঠে অমর হয়ে আছে, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’, ‘ও হাসিনা জুলফোওয়ালি’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দাম মারো দাম’, ‘রঙ্গিলা রে’, ‘রাধা ক্যায়সে না জালে’, ‘কাহিঁ আগ লাগে’, ‘রোজ রোজ আঁখো তলে’, ‘এক ম্যায় অউর এক তু’, ‘জাওয়ানি জানে মান’, ‘দো লফজো কি কাহানি’, ‘রাত আকেলি হ্যায়’, ‘ও মেরি সোনা রে’, ‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘তুমসে মিলকে’, ‘তু হ্যায় ওহি’, ‘এক হাসিনা থি’, ‘ইন আঁখো কি মাস্তি’, ‘অ্যায় মেহেরবান’, ‘ক্যায়া গজব করতে হো জি’, ‘ইয়ে মেরা দিল ইয়ার কা দিওয়ানা’, ‘হাঙ্গামা হো গ্যায়া’, ‘রাত বাকি বাত বাকি’, ‘পারদে মে রেহনে দো’, ‘কই সেহেরি বাবু’, ‘এ লাড়কা হায় আল্লাহ’, ‘খুল্লাম খুল্লা পেয়ার কারেঙ্গে’, ‘ভোলি ভোলি সি এক সুরাত’, ‘ও সাথি রে’সহ অসংখ্য গান।
শুধু হিন্দি নয়, বাংলা গানেও আশা ভোঁসলের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তার কণ্ঠে গাওয়া বহু বাংলা গান আজও শ্রোতার মনে সমানভাবে জীবন্ত।
‘তোমারই চলার পথে আমি’, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’, ‘কথা দিলাম আমি কথা দিলাম’, ‘আর কত রাত একা থাকব’, ‘ফুল কেন লাল হয়’, ‘ছোট্ট একটা ভালোবাসা’, ‘কত না ভাগ্য আমার’, ‘আমি মন দিয়েছি’, ‘মায়াবী এ নেশা’, ‘একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও’, ‘আকাশে সূর্য আছে যতদিন’, ‘বন্ধ মনের দুয়ার’, ‘প্রেম কিসে হয়’, ‘নাগর আমার কাঁচা পিরিত’, ‘আজ আকাশে রঙের খেলা’, ‘মধুবনে বাঁশি বাজে’, ‘নাচ ময়ূরী নাচ রে’, ‘আধো আলো ছায়াতে’, ‘তুমি আমার নয়ন গো’, ‘জানা অজানা পথে চলেছি’, ‘আরো কাছাকাছি’, ‘চোখে নামে বৃষ্টি’, ‘কি জাদু তোমার চোখে’, ‘আমি জানি না কেন’, ‘আমি অন্ধকারের যাত্রী’, ‘খুব চেনা চেনা মুখখানি তোমার’, ‘শোনো এইতো সময়’, ‘যেতে যেতে পথে হলো দেরি’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, এমন বহু গান তার কণ্ঠে পেয়েছে ভিন্ন এক আবহ।
বাংলা গানে তার উচ্চারণ, আবেগ ও কণ্ঠের স্বাভাবিক মাধুর্য তাকে এ অঞ্চলের শ্রোতাদের কাছেও করে তুলেছিল আপন।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে আশা ভোঁসলে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। ১৯৮১ সালে তিনি প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এরপর ১৯৮৮ সালেও পান জাতীয় পুরস্কার। ২০০০ সালে তাকে দেওয়া হয় দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ২০০৮ সালে ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণে ভূষিত হন তিনি।
তবে পুরস্কার কিংবা স্বীকৃতির হিসাব দিয়ে আশা ভোঁসলের সংগীতজীবনের মাহাত্ম্য পুরোপুরি মাপা সম্ভব নয়। কারণ তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো সেই অগণিত শ্রোতার ভালোবাসা, যারা দশকের পর দশক তার গান শুনেছেন, গুনগুন করেছেন, নিজেদের জীবনের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছেন তার কণ্ঠ।
বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে মারা যান।

