সাল ২০১৬। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনাল। আবারও মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও চিলি।
ঠিক এক বছর আগে এই চিলির কাছেই টাইব্রেকারে হেরে শিরোপাখরা আরও দীর্ঘ হয়েছিল আর্জেন্টিনার। তাই ওই ফাইনাল শুধু একটি ট্রফির লড়াই ছিল না, এটি ছিল লিওনেল মেসির হাতে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা ওঠার আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ।
নির্ধারিত সময়ের খেলা থাকল গোলশূন্য। অতিরিক্ত সময় না থাকায় ম্যাচ গড়াল সরাসরি টাইব্রেকারে।
প্রথম শট নিলেন আর্তুরো ভিদাল। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো দুর্দান্ত দক্ষতায় সেটি রুখে দিলেন। এরপর আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম শট নিতে এলেন মেসি। কেবল পুরো আর্জেন্টিনা নয়, বরং গোটা ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে ছিল তার দিকে। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে মেসির শট বারের ওপর দিয়ে চলে গেল।
চিলির পরের চারটি শটই জালে জড়ায়। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার হয়ে লুকাস বিগলিয়া পেনাল্টি মিস করলে শেষ হয়ে যায় সব আশা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হার মানে আর্জেন্টিনা। শিরোপার এত কাছে এসেও আবারও খালি হাতেই ফিরতে হয় মেসিদের। জাতীয় দলের হয়ে বহু প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক ট্রফি তখনও অধরাই থেকে যায়।
এই হতাশা আর সহ্য করতে পারেননি মেসি। ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আচমকা অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
বিদায়ের মুহূর্তে তার কণ্ঠে ঝরে পড়েছিল অসীম বেদনা, ‘আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু মনে হয় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জেতা আমার ভাগ্যে নেই।’
মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ফুটবল বিশ্ব। তাকে ফেরানোর জন্য শুরু হয় অসংখ্য আবেদন। সতীর্থ, কোচ, সাবেক খেলোয়াড়, সমর্থক— সবার কণ্ঠে একটাই আহ্বান, ‘ফিরে এসো।’
শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি সমর্থকের ভালোবাসা আর দেশের প্রয়োজনের কাছে হার মানেন মেসি। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ধুঁকতে থাকা আর্জেন্টিনার শেষ ভরসা হয়ে তিনি আবারও ফিরে আসেন।
বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচ। প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর। সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করতে হলে জয়ের বিকল্প নেই। ম্যাচটি কুইটোতে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচুতে। যেখানে ২০০১ সালের পর কোনো ম্যাচ জেতেনি আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের শুরুতেই গোল করে বসে ইকুয়েডর। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন তখন ঝুলছে সূক্ষ্ম এক সুতোর ওপর।
কিন্তু সেদিন মাঠে ছিলেন এক ফুটবল জাদুকর।
একাই হ্যাটট্রিক করে ম্যাচটি ৩-১ গোলে জিতিয়ে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের মূলপর্বে তুলে নেন মেসি। অনেকের কাছেই এটি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।
তবে ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। সেই ব্যর্থতার পর কোচ হোর্হে সাম্পাওলির বিদায় ঘটে এবং জাতীয় দলের দায়িত্ব পান লিওনেল স্কালোনি।
২০১৯ কোপা আমেরিকায় তার অধীনে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠলেও ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নেয়। কিন্তু সেই পরাজয়ই যেন হয়ে ওঠে এক নতুন যুগের সূচনা।
২০২১ সাল। মারাকানা স্টেডিয়াম— যে মাঠে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ভেঙেছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
সাত বছর পর সেই একই মারাকানাতেই ইতিহাস বদলে দেন মেসি।
আনহেল দি মারিয়ার লক্ষ্যভেদে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে অবশেষে ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন তিনি। ২৮ বছরের শিরোপাখরা ঘুচে যায় আর্জেন্টিনার। মেসি হন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা। শুধু গোল নয়— সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট, সবচেয়ে বেশি সুযোগ সৃষ্টি, সফল ড্রিবল— প্রায় প্রতিটি আক্রমণাত্মক পরিসংখ্যানে ছিল তার একচ্ছত্র আধিপত্য।
সেই অনন্য পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে তৎকালীন রেকর্ড সপ্তমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নেন মেসি।
এরপর ফিনালিসিমায় ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আরও একটি শিরোপা যোগ করে আর্জেন্টিনা।
তারপর আসে ২০২২।
কাতারে মরুর বুকে নিজের ফুটবল জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায় রচনা করেন মেসি। জাদুকরী পারফরম্যান্সে ৩৬ বছরের বিশ্বকাপখরা ঘুচিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন তৃতীয় শিরোপা। টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো জেতেন গোল্ডেন বল। সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স তাকে এনে দেয় রেকর্ড অষ্টম ব্যালন ডি’অর।
২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে মেসি প্রমাণ করেন— তার গল্প তখনও শেষ হয়নি।
মেসির নেতৃত্বে এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ফের দলের সবচেয়ে বড় কারিগর ও ভরসা তিনিই। নামের পাশে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। বয়স ৩৯ পেরিয়ে গেলেও তিনি আগের মতোই ব্যবধান গড়ে দিচ্ছেন, বরং আরও ক্ষুরধার হয়ে।
রোববার রাতে ফাইনালের ভেন্যু আবারও সেই মেটলাইফ স্টেডিয়াম— যা এই বিশ্বকাপে ফিফার অফিসিয়াল নামে নিউইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত।
যে স্টেডিয়ামের পরাজয় একদিন মেসিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছিল, ঠিক ১০ বছর পর সেই একই মাঠেই দাঁড়িয়ে তিনি আরেকটি ইতিহাস লেখার অপেক্ষায়।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ঝুলিতে আরেকটি বিশ্বকাপ যোগ করার পথে তার প্রতিপক্ষ স্পেন— সেই দেশ, যেখানে তার বেড়ে ওঠা, যেখানে এক কিশোর মেসি পরিণত হয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের একজন।
আজ কি মেসি ১০ বছর আগের সেই কান্নাকে আনন্দাশ্রুতে বদলে দিতে পারবেন? যে মাঠে একদিন মনে হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নেমে গেছে, সেই মাঠেই কি তিনি আরেকবার বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরবেন?
নাকি ভাগ্য আবারও তাকে রানার্সআপের বেদনা উপহার দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ অধ্যায় লিখবে?
সেমিফাইনালের পর সতীর্থ আলেক্সিস মাক আলিস্তার মুচকি হেসে মেসিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা যদি তোমাকে চ্যাম্পিয়ন বানাতে পারি, তাহলে কি তুমি আরও দুই বছর আমাদের সঙ্গে খেলবে?’ মেসি কোনো উত্তর দেননি, শুধু হেসেছিলেন।
বিশ্বের কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থক আবারও একই প্রার্থনায় সমবেত হচ্ছে— মেসি যেন শেষটা রাঙান জয়ে। সেই অশ্রু যেন আনন্দাশ্রু হয়ে ফিরে আসে। পাশাপাশি ফুটবল বিশ্ব যেন অন্তত আরও কিছুদিন এই ফুটবল জাদুকরের পায়ের জাদু দেখার সৌভাগ্য লাভ করে।

