খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের শান্ত তীরের গ্রাম রাড়ুলী। চারদিকে শতবর্ষী গাছপালা আর পুরোনো দালানকোঠার মাঝে আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে বিরাজমান বরেণ্য বিজ্ঞানী ও সমাজসংস্কারক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মভিটা।
১৮৬১ সালের ২ আগস্ট এই গ্রামেই জন্ম নেন তিনি। আজ রোববার তার ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
পি সি রায় কেবল একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আজীবন সমাজহিতৈষী। গবেষণার পাশাপাশি তিনি নিজ গ্রাম রাড়ুলীর শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষে আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
১৯০৩ সালে তিনি রাড়ুলী, কাটিপাড়া, বাটী ও কুমারখালী—এই চার গ্রামের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বাবার স্মরণে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আর কে বি কে হরিশচন্দ্র ইনস্টিটিউশন’।
কেবল পি সি রায় নন, তার পরিবারও ছিল শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক। এর আগে ১৮৫০ সালে তার বাবা হরিশচন্দ্র রায় নিজের মা ভুবনমোহিনীর নামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ভুবনমোহিনী বালিকা বিদ্যালয়’। সেই আমলে নারীশিক্ষার প্রসারে এটি ছিল অত্র অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও সাহসী উদ্যোগ।
এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ১৯০৯ সালে তিনি এলাকায় একটি সমবায় ব্যাংকও গড়ে তোলেন, যা দক্ষিণবঙ্গের সমবায় আন্দোলনের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে পরিচিত।
অবহেলা, দখল, আইনি জটিলতা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণে পি সি রায়ের জন্মভিটা আজও পুরোপুরি সংরক্ষিত হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ভিটার বড় অংশ দখলে চলে যায় এবং সংস্কারের অভাবে বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়তে থাকে।
বিজ্ঞানীর জন্মভিটার কিছু অংশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এসেছে। অধিদপ্তর কিছু সংস্কারকাজও সম্পন্ন করেছে। তবে তা যথেষ্ট মনে করছেন না বিজ্ঞানপ্রেমী, গবেষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৭ নভেম্বর আচার্য পি সি রায়ের বাড়ির সদরমহল, নাটমন্দির ও কাচারিবাড়ি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে অধিদপ্তরের আওতায় আনা হয়। এরপর ধাপে ধাপে কিছু সংরক্ষণমূলক কাজ করা হয়।
২০১২–১৩ অর্থবছরে পূর্ব ও দক্ষিণ পাশের কক্ষ, পশ্চিম পাশের দোতলা বারান্দার ছাদ, বিম, কার্নিশ ও টালির ছাদ সংস্কার করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের দেয়াল মেরামত এবং প্লাস্টার সংস্কারের কাজও সম্পন্ন হয়।
২০১৪–১৫ অর্থবছরে দর্শনার্থীদের জন্য বাংলা ও ইংরেজিতে পরিচিতি ফলক স্থাপন করা হয়, যাতে বিজ্ঞানী পি সি রায়ের জীবন ও অবদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হয়।
গত বছরের ডিসেম্বরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন করে সংস্কারকাজ শুরু করে। বর্তমানে উত্তর পাশের দ্বিতল ভবনের পাঁচটি কক্ষ, দুটি বারান্দা, বাইরের প্লাস্টার, রং এবং নান্দনিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের কাজ চলছে।
দরজা-জানালা বাদ দিয়ে মূল কাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ করা হচ্ছে। পরে বাড়ির ভেতরের অংশ এবং মন্দির সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে অধিদপ্তরের।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ভবন সংস্কার করলেই হবে না। পি সি রায়ের পুরো জন্মভিটাকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করা জরুরি।
তাদের দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞান ঐতিহ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক, যেখানে থাকবে বিজ্ঞান জাদুঘর, গবেষণা ও তথ্যকেন্দ্র, আধুনিক ডিসপ্লে গ্যালারি, অডিটোরিয়াম, পর্যটক বিশ্রামাগার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় স্মৃতি সংসদের সভাপতি মুহাম্মদ কওসার আলী গাজী বলেন, আচার্য পি সি রায় শুধু বাংলাদেশের নন, তিনি বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী। তার জন্মভিটাকে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যকেন্দ্রে পরিণত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাইকগাছাস্থ দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নাম পি সি রায়ের নামে নামকরণ করা হলে নতুন প্রজন্ম তার অবদান সম্পর্কে আরও জানতে আগ্রহী হবে।
একইসঙ্গে তিনি এই বিজ্ঞানীর জন্মভিটার অবশিষ্ট জমি অধিগ্রহণ, দীর্ঘদিনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, বিজ্ঞান জাদুঘর, অডিটোরিয়াম, রেস্ট হাউস, আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ এবং বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্মকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
এ ছাড়া স্মৃতি সংসদের পক্ষ থেকে রাড়ুলীর ঐতিহ্যবাহী ভুবনমোহিনী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং আর কে বি কে হরিশচন্দ্র ইনস্টিটিউশনকে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত করে জাতীয়করণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আচার্য পি সি রায়ের জরাজীর্ণ জন্মভিটার মূল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারকাজ চলছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে মূল বাড়ির অন্দরমহলে সংস্কার কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো বাড়ির সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাউন্ডারি ওয়াল এবং একটি ‘ডিসপ্লে রুম’ নির্মাণেরও পরিকল্পনা আছে।
তিনি আরও জানান, মূল বাড়ি, পুকুরসহ মোট সম্পত্তি ৩ দশমিক ৪২ একর। এর মধ্যে মূল বাড়ি ও পুকুরসহ ১ দশমিক ৪৩ একর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় আছে। বাকি ২ দশমিক ২৯ একর জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।
তিনি আরও বলেন, মামলা নিষ্পত্তি হলে অবশিষ্ট অংশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

