প্রতি বছর ঈদুল আজহার বিকেল নামতেই মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দি বাজারে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। মনু নদীর তীরঘেঁষা প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এই সড়ক, যেখানে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রাচীন চামড়ার হাট।
এই হাটই কোরবানির পর ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, রিকশায় আসা ব্যবসায়ী, মৌসুমি শ্রমিক ও বিক্রেতাদের ভিড়ে ভরে ওঠে।
চাঁদনীঘাট ইউনিয়নে মনু নদীর তীরে ব্রিটিশ আমলে প্রায় ২০০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই বাজার দীর্ঘদিন ধরে চামড়া ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সারা বছর কমবেশি বেচাকেনা চললেও ঈদুল আজহার আগে ও পরের কয়েকটি দিনই হাটের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।
চাঁদনীঘাট ব্রিজ থেকে বালিকান্দি বাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠে স্থায়ী ও অস্থায়ী চামড়ার গুদাম। শত শত শ্রমিক ব্যস্ত হয়ে পড়েন চামড়া পরিষ্কার, লবণ মাখানো ও রাতভর প্রক্রিয়াজাতের কাজে। স্থানীয়দের ভাষায়, এই সময়ে রাত আর দিনের পার্থক্য থাকে না।
ঈদের সকালে বালিকান্দি-চাঁদনীঘাট সড়কে দেখা যায় আরেক পরিচিত দৃশ্য। গ্রাম ও মৌলভীবাজার শহর থেকে দরিদ্র নারী পুরুষেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করা গরুর মাংস বস্তায় ভরে নিয়ে আসেন বাজারে। নিজেদের জন্য কিছু রেখে বাকিটা বিক্রি করেন। সরবরাহের পরিমাণ বুঝে বিক্রেতারা প্রতি বস্তা দেড় হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকেন। তবে ক্রেতারা অনেক সময় তার অর্ধেক বা তারও কম দামে দরাদরি করেন।
সারা বছর বাজারে পাঁচ থেকে ছয়জন স্থায়ী ব্যবসায়ী থাকলেও ঈদের সময় যোগ দেন আরও প্রায় ৫০ জন মৌসুমি ব্যবসায়ী। তারা কয়েকশো চামড়া কিনে লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করেন এবং পরে ঢাকার বড় ব্যবসায়ী বা ট্যানারির কাছে বিক্রি করেন।
শ্রমিকদের কাজ ও পারিশ্রমিকও ভিন্ন ধরনের। কেউ মজুরির ভিত্তিতে চামড়া পরিষ্কার করেন, আবার কেউ চামড়া থেকে ছাঁটা মাংসটুকুকেই পারিশ্রমিক হিসেবে নেন।
রাত প্রায় ৯টার দিকে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পা ফেলারও জায়গা নেই। প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে মানুষের ভিড় আর স্তূপ করে রাখা কাঁচা চামড়া। বৃষ্টির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যেতে অনেকেই মাথার ওপর ত্রিপল টানিয়ে নিয়েছেন। কোথাও ট্রাক থেকে চামড়া নামানো হচ্ছে, কোথাও পিকআপ বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে থামছে। কেউ আগে থেকেই আড়তদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চামড়া নিয়ে এসেছেন, আবার কেউ বাজারে এসে দরদাম করে বিক্রি করছেন।
খুচরা বিক্রেতাদের অনেকে জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম কম। তারপরও বিনিয়োগ ও পরিবহন খরচের কিছুটা তুলতে মরিয়া হয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।
দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পরই শুরু হয় চামড়া প্রক্রিয়াজাতের ব্যস্ততা। কেউ চামড়ার সঙ্গে লেগে থাকা মাংস আলাদা করছেন, কেউ সেই মাংস বিক্রি করছেন। কোথাও কাঁচা চামড়া পরিষ্কার করা হচ্ছে, কোথাও আবার লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণের প্রস্তুতি চলছে। এসব কাজের জন্য রয়েছে আলাদা শ্রমিক দল, যারা বছরের এই একটি রাতেই কাজের সুযোগ পান।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০১৩-১৪ সাল থেকে ঢাকা ও নাটোরের ট্যানারি মালিকরা নানা অজুহাতে পাওনা টাকা আটকে রাখা বা দেরিতে পরিশোধ করায় অনেক স্থানীয় ব্যবসায়ী পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এই মৌসুমে একটি বড় গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ৭০০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, দাম কম হলেও গত কয়েক বছরের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা ভালো।
বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কাজের ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে শ্রমিকদের দেড় হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মিফতা মিয়া দ্য ডেইকি স্টারকে বলেন, বালিকান্দির চামড়ার হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটা একটা জীবন্ত ঐতিহ্য। দুইশো বছর ধরে আমাদের মতো পরিবারগুলো এই ব্যবসার ওপর নির্ভর করে জীবিকা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু ঢাকার ট্যানারি মালিকরা যখন মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর টাকা আটকে রাখেন, তখন ঐতিহ্যের কী মূল্য থাকে? লবণ, শ্রম আর পরিবহনের খরচ বহন করে শেষ ধাপে এসে ঠকতে হয়। সরকারকে ন্যায্য পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে এবং ট্যানারিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এই হাট মরে গেলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে না, দুইশো বছরের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও হারিয়ে যাবে।
চামড়া ব্যবসায়ী হাফিজ মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ক্ষুদ্র সংগ্রহকারী ও গ্রামীণ প্রক্রিয়াজাতকারীরা পুরোপুরি বড় ট্যানারিগুলোর দয়ার ওপর নির্ভরশীল। কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি নেই, মূল্য নিশ্চয়তার ব্যবস্থাও নেই। টাকা আটকে গেলে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও সীমিত। সরকার মাঝেমধ্যে দাম নির্ধারণ করে, কিন্তু তার বাস্তব প্রয়োগ নেই।
বালিকান্দি বাজারের বাসিন্দা শাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরের লোকেরা হয়তো এখানে শুধু চামড়া আর লবণ দেখেন। কিন্তু যারা এখানে বড় হয়েছি, তারা দেখি আরও অনেক কিছু। এটা একটা সামাজিক উৎসব, গরিব পরিবারগুলোর মৌসুমি আয়ের উৎস এবং আমাদের দাদা-নানার জীবনধারার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য। ঈদের সকালে যখন দরিদ্র নারীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস সংগ্রহ করে এখানে বিক্রি করতে আসেন, সেটা শুধু ব্যবসা নয়, এক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও।’
চাঁদনীঘাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও বালিকান্দি চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. শাওকাত ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের বাবা-দাদা সবাই চামড়ার ব্যবসা করেছেন। প্রায় দুইশো বছর ধরে এই ব্যবসা চলে আসছে। এখন সারা বছর নিয়মিত ব্যবসা করেন মাত্র চার থেকে পাঁচজন। দীর্ঘদিন লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে এখনও আমার প্রায় এক কোটি টাকা পাওনা আটকে আছে।’

