হাওরে বন্যায় ধানের ক্ষতি, যেমন প্রভাব পড়তে পারে চালের বাজারে

এ বছর হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ভালো ফলনের আশা ছিল। কৃষকেরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফসল কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ করছিলেন। কিন্তু এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে থেকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফসল রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভারতের উজান থেকে আসা ঢলে ধান কাটার মৌসুমে হাওরাঞ্চলের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। এতে ধান উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও দামের ওপর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বোরো শুষ্ক মৌসুমের সেচনির্ভর ধান। এটি ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত রোপণ করা হয়। আর কাটা হয় এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে। এই মৌসুমে দেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি হয়। শুধু সাতটি হাওর জেলা গত মৌসুমে দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জোগান দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী বাংলাদেশের জন্য এই মৌসুমের উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন খাদ্য নিরাপত্তায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজারে দামের প্রভাব বোঝা যাবে আরও ২ সপ্তাহ পর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাওরের ৭ জেলায় বোরো ধানের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে ছিল।

এ বছর সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাতটি হাওর জেলায় ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেক হাওর এলাকায় অবস্থিত। এর মধ্যে ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে।

গত বোরো মৌসুমে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ টনের বেশি ফলন হয়েছিল। সেই হিসাবে এবার ৩ লাখ টনেরও বেশি ধান ঝুঁকিতে রয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এটি গত মৌসুমের মোট ২ দশমিক ১৩ কোটি টন বোরো উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) মো. জামাল উদ্দীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হাওরের ৬৩ দশমিক ৯১ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

এদিকে, সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ের আগে অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই।

গতকাল বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ৭ দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, হাওরের নিম্নাঞ্চলের প্রধান নদী সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বৌলাই ও ভুগাই-কংস ৩ মের মধ্যে একইসঙ্গে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোণায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সময়ে মোট ১৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। ৫ মের পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হতে পারে।

বন্যা এমন একটি ফসলকে আঘাত করছে, যা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মৌসুমে ধান উৎপাদন শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমতে পারে।

এতে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সার সংকটের ফলে সেচ-সার ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটায় বোরো ফলন কমার জন্য আংশিকভাবে দায়ী।

সার সংকট, বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারণে হাওরাঞ্চলে বোরো উৎপাদন ২০ শতাংশ ও জাতীয়ভাবে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান।

উৎপাদন ক্ষতি বাজারে দামের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো বলা সম্ভব নয়। নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া ও জয়পুরহাটের মতো প্রধান উৎপাদন এলাকায় সম্প্রতি মাত্র ধান কাটা শুরু হয়েছে।

নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি বোঝা যাবে।

তিনি বলেন, উত্তরের এই অঞ্চলে ফলন ভালো হলে হাওরের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একইসঙ্গে বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসতে পারে। তবে পুরো ফসল কাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসল প্রভাব বোঝা যাবে না। তাই এখনই সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল ডেইলি স্টারকে বলেন, ২-৩ দিন শুষ্ক আবহাওয়া থাকলেই বাকি ফসল ঝুঁকির বাইরে থাকবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ক্রয়) মো. মনিরুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হবে না। ফলে বাজারে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।

অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস ডেইলি স্টারকে বলেন, এ বছরের বৃষ্টিজনিত ক্ষতি জাতীয় দামে খুব সামান্য প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারের প্রায় ১৩ লাখ টন মজুত বড় ধরনের বাজার অস্থিরতা ঠেকাতে সহায়তা করবে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে হাওর জেলাগুলোতে, যেখানে বোরোই একমাত্র ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নিজেদের চাহিদার জন্য বাজারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে, যা জাতীয়ভাবে বড় পরিবর্তন না আনলেও স্থানীয়ভাবে চাহিদার চাপ তৈরি করবে।

অন্যদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। বুধবার খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানার সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে কৃষকদের বেসরকারি চালকল ও সরকারি গুদাম ব্যবহার করে বিভাগীয় সহায়তায় ধান শুকানোর অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, খাদ্য অধিদপ্তর শুকানো ধান সরাসরি সংগ্রহ করবে। পাশাপাশি মিল মালিকদের দ্রুত ধান কেনার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে, যেন সরকার সর্বোচ্চ সংগ্রহ নিশ্চিত করতে পারে ও মিলগুলো সচল থাকে।

অধ্যাপক বায়েস বলেন, নির্ধারিত ক্রয়মূল্যের মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ‍ও হয়রানি ছাড়া কৃষকেরা যেন তাদের ফসল বিক্রি করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

Related Articles

Latest Posts