সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার শঙ্কা

সাইবার অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতভেদ না থাকলেও প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে অপতথ্য, মানহানি, কনটেন্ট ব্লক ও গ্রেপ্তারের মতো বিধানের অপব্যবহারের আশঙ্কা করছেন সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা।

তাদের মতে, যথাযথ সুরক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে অতীতের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নতুন আইনটিও স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং আলোচনায় উঠে আসা উদ্বেগগুলো বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। তবে অপতথ্য ও অনলাইনে সংঘাত সৃষ্টিকারী কনটেন্ট মোকাবিলায় কিছু আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেও সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আজ শনিবার রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) আয়োজিত ‘বিজেসির পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বক্তব্য উঠে আসে। সেমিনারটি আয়োজনে কারিগরী সহযোগিতা দিয়েছে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন।

সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইন এখনো পাস হয়নি, ফলে এটি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।’

‘আপনারা যে উদ্বেগগুলো প্রকাশ করেছেন, সরকার সেগুলো বিবেচনা করবে। আমি আমার জায়গা থেকে আপনাদের কথাগুলো যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করব,’ বলেন তিনি।

তিনি জানান, অপতথ্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে অনলাইনে গুজব ও অপতথ্যের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তবে সংজ্ঞা অস্পষ্ট হলে এবং প্রয়োগের যথাযথ প্রক্রিয়া না থাকলে অপতথ্যবিরোধী বিধানও অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা।

জাহের উর রহমান জানান, কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে আগের ব্যবস্থায় যে সুযোগ ছিল, সেখানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সভায় এ নিয়ে যে উদ্বেগ উঠেছে, বিশেষ করে আপিলের ব্যবস্থা এবং দ্রুত কনটেন্ট ব্লকের ক্ষমতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো তিনি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তুলে ধরবেন।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের আশঙ্কা আমি উড়িয়ে দিচ্ছি না। কারণ আমাদের সবার মাথায় শেখ হাসিনার সরকারের শেষ সময়ের অভিজ্ঞতা আছে। তিনি কীভাবে এ ধরনের আইনের অপব্যবহার করেছেন, সেটি আমাদের মনে আছে।’

তবে বর্তমান সরকারকে আগের সরকারের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকারের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর।

‘স্বৈরাচারী সরকারের মিডিয়ার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার লাভ থাকে, কারণ তারা মিডিয়ার কণ্ঠ বন্ধ করতে চায়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য এটি উল্টো ক্ষতির কারণ হয়,’ বলেন তিনি।

নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী জানান, সাংবাদিকতায় এমন সেলফ-সেন্সরশিপের পরিবেশ তিনি তার দীর্ঘ কর্মজীবনে আগে দেখেননি।

‘এমনিতেই আমরা সেলফ-সেন্সরশিপের জ্বালায় ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। ৫৪-৫৫ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বাংলাদেশে এর আগে কখনো এমন সেলফ-সেন্সরশিপ ছিল না,’ বলেন তিনি।

নতুন আইন হলে এ প্রবণতা আরও বাড়বে এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সংকুচিত হবে বলে মত দেন তিনি।

‘এই আইন সেলফ-সেন্সরশিপকে আরও উৎসাহিত করবে এবং সাংবাদিকদের হাত-পা আরও বেঁধে দেবে। এতে আমাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে,’ বলেন তিনি।

মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আইন করে কি কাউকে দায়িত্বশীল করা যায়? দায়িত্বশীল হতে হলে সেটা তার নিজের বোধ থেকেই হতে হবে।’

আইনটি প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন হলেও সেটি যেন স্বাধীন মতপ্রকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

‘সাইবার অপরাধ ঠেকাতে গিয়ে যদি বাকস্বাধীনতা নষ্ট হয়, তাহলে আইনের উদ্দেশ্যই ভিন্ন হয়ে যায়,’ বলেন তিনি।

তিনি প্রস্তাবিত খসড়াটি পুনর্লিখনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান এবং এ প্রক্রিয়ায় সাইবার, গণমাধ্যম ও আইন বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

মাহফুজ আনাম জানান, সাইবার অপরাধ এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের বিষয় দুটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

‘আমার পছন্দের অবস্থান হলো—দুটি আলাদা আইন করা যেতে পারে। একটি আইন হবে মিডিয়া, অনলাইন, টেলিভিশনসহ স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রগুলোর জন্য; আরেকটি হবে সাইবার অপরাধীদের জন্য,’ বলেন তিনি।

সেটি সম্ভব না হলে একই আইনে দুই ক্ষেত্রের জন্য আলাদা প্রয়োগের নীতি ও সুরক্ষা রাখার প্রস্তাব দেন তিনি।

মাহফুজ আনাম বলেন, অতীতে সাইবার অপরাধ দমনের নামে করা আইন সাংবাদিক, লেখক ও কার্টুনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

‘আমরা এখনো বিশ্বাস করতে চাই, বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য তা নয়। যদি সত্যিই তা না হয়, তাহলে আমার অনুরোধ থাকবে—আইনটি বাতিল না করলেও অন্তত পুনর্লিখনের উদ্যোগ নেওয়া হোক,’ বলেন তিনি।

প্রস্তাবিত আইনে ফৌজদারি মানহানির বিধান রাখা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।

‘আমার প্রস্তাব আরও স্পষ্ট—মানহানি কোনো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে থাকা উচিত নয়,’ বলেন তিনি।

তিনি জানান, দেওয়ানি মানহানির ব্যবস্থা থাকতে পারে এবং প্রেস কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়িয়ে কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু ফৌজদারি মানহানি থাকলে সমালোচনা ও ভিন্নমত দমনে মামলা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘গণতন্ত্রে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সমালোচনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে। সমালোচনা করলেই কথায় কথায় মামলা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়,’ বলেন সারা হোসেন।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে এ ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে।

‘এই ধরনের ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে আনা হলে সেই আশঙ্কাই থেকে যায়,’ বলেন তিনি।
কনটেন্ট বা কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো ক্ষমতাকেও অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘শুধু আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নয়, অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলে সংশোধনীগুলো পুনর্বিবেচনা করা দরকার।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, ফৌজদারি মানহানি বাদ দেওয়ার পাশাপাশি কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।

‘চাইলেই কোনো তথ্য বা সম্পূর্ণ কনটেন্ট ব্লক করে দেওয়ার সুযোগ রাখা হলে সেই আইন কেবল আমাদের ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনকে সংকুচিত করবে,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে আইনে স্পষ্ট শর্ত, বৈধ উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার নীতি থাকতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন পর্যালোচনার সুযোগও থাকতে হবে।

প্রটেকশন কাউন্সিলের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাহমিনা রহমান বলেন, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো কাউন্সিল গঠন করে ওভারসাইটের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা কার্যকর হবে না এবং শেষ পর্যন্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করবে।’

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সোশ্যাল সায়েন্সেস স্কুলের ডিন ও মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান বলেন, ‘সাইবার সিকিউরিটি, সাইবার ক্রাইম ও অনলাইন এক্সপ্রেশন তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, যা একটি আইনের আওতায় রাখার সমস্যাই প্রস্তাবিত আইনে দেখা দিয়েছে।’

‘অন্তত অনলাইন এক্সপ্রেশনকে আলাদা করা গেলে ভালো হয়,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘জেল-জরিমানার ভয়ের কারণে সাংবাদিকতা এখন একটি ভীতিকর পেশায় পরিণত হয়েছে এবং প্রস্তাবিত আইন সেই ভয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।’

সভায় বিজেসির পক্ষে প্রস্তাবিত সংশোধনীর পর্যালোচনা তুলে ধরে সংগঠনের নির্বাহী সদস্য মিল্টন আনোয়ার পাঁচ দফা প্রস্তাব দেন।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘গুজব’ বা ‘অযাচাইকৃত তথ্য’-কে ঢালাওভাবে ফৌজদারি অপরাধ না করা; নারী ও শিশু সুরক্ষার ধারা থেকে মানহানি ও ‘হেয় প্রতিপন্ন করা’ আলাদা করা; কনটেন্ট সরানোর ক্ষেত্রে লিখিত কারণ, নোটিশ ও স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা; বেআইনি গ্রেপ্তার, নজরদারি বা কনটেন্ট সরানোর শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা; এবং সংশোধনী চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও অর্থবহ আলোচনা করা।

সভায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিজেসি চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ সভায় সভাপতিত্ব করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সদস্যসচিব ইলিয়াস হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন।

Related Articles

Latest Posts