শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলেছে, তবু চীনে রপ্তানি বাড়ছে না বাংলাদেশের

চীন ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা চালু করে। পরে ২০২৪ সালে প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেই সেই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়। এতে বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির বাজারে প্রবেশের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও এক বিলিয়ন ডলারের নিচে।

এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা নয়, চীনের বাজারে কার্যকর প্রবেশের জন্য প্রয়োজন চীনা বিনিয়োগ, বাজার-জ্ঞান, বিতরণ নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় অংশীদারিত্ব।

বাংলাদেশ প্রতি বছর চীন থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এর মধ্যে রয়েছে যন্ত্রপাতি, শিল্প সরঞ্জাম ও কাঁচামাল, যা দেশের উৎপাদন খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। বিপরীতে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করে এর সামান্য অংশ।

চীন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা দেয়, বাংলাদেশ তার আওতায় রয়েছে। তবে শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি।

মূল সমস্যা কাঠামোগত।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ চীন নিজেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে দেশটি, যা বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ।

চীন বছরে ২ দশমিক ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি পণ্য আমদানি করে। একই সঙ্গে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাকও আমদানি করে দেশটি।

তবে বাংলাদেশ যদি চীনের পুরো পোশাক আমদানি বাজারও দখল করতে পারে, তবুও তা চীন থেকে বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় অর্ধেকের সমান হবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বাংলাদেশ চীনে ৭৪২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৭১৫ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক উৎপাদন সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়ার ফলে চীন থেকে আমদানিও ক্রমাগত বাড়ছে।

বিশেষ করে পোশাকশিল্প আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় এসব কাঁচামালের বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা ছিল ৪ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ও চীন বর্তমানে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও আলোচনা করছে। এ বিষয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

তবে সরকার এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। কারণ চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে।

এছাড়া, চীন-নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যোগদানের সম্ভাবনা বিবেচনায়ও দেশটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশে চীনা এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় দুই হাজার চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই পোশাক খাতে।

‘চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব’

সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, শিল্প উপকরণের প্রধান উৎস হিসেবে চীনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব।

তার ভাষায়, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত লজিস্টিকস এবং কম সরবরাহ-সময়ের (লিড-টাইম) কারণে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং গন্তব্য হিসেবে রয়েছে।

বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ শিল্পযন্ত্রও এসব কারণেই চীন থেকে আমদানি করা হয়।

তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম। চীনা প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে যন্ত্রপাতি মেরামত করাতে দিনে ৬০ থেকে ১০০ ডলার খরচ হয়। অথচ ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবিদদের ক্ষেত্রে আবাসন ব্যয় ছাড়া দৈনিক খরচই ৬০০ থেকে ৮০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মো. খোরশেদ আলম বলেন, দামের কারণে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো সহজ হবে না।

তার মতে, বিকল্প উৎসের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম দামে চীনা পণ্য পাওয়া যায়।

চীনা অংশীদারিত্ব ছাড়া সাফল্য কঠিন

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, চীনে বাংলাদেশের দুর্বল রপ্তানি পারফরম্যান্স দেখিয়ে দেয় যে শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে বাজার তৈরি করা যায় না।

তার ভাষায়, চীনা ভোক্তা ও প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের পণ্য চায়, আমরা এখনও সেগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করতে পারছি না।

তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে চীনের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের মাধ্যমে বড় অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ সীমিত।

তার মতে, বড় চ্যালেঞ্জটি বাণিজ্যিক।

চীনের খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক, বিতরণব্যবস্থা ও সোর্সিং চেইনের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য সে দেশের বাজারে উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নেওয়া কঠিন হবে।

রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি মডেল, যেখানে চীনা প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা যৌথ উদ্যোগে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) চীনা বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন করবে।

এ ধরনের অংশীদারত্ব বাজার-জ্ঞান, পণ্যের নকশা, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এনে দিতে পারে।

তার ভাষায়, শুল্কের দরজা খোলা আছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হলে আমাদের প্রয়োজন উপযুক্ত পণ্য এবং কার্যকর বাণিজ্যিক সংযোগ।

রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর চীনের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তার মতে, চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ কোনো এফটিএর মূল সুবিধা হবে দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা নিশ্চিত করা, চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক ও শুল্কবহির্ভূত বাধা কমানো।

তবে এ ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

রাজ্জাক বলেন, চীন বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটি, যার সরবরাহ সক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া কোনো এফটিএ দেশীয় শিল্পের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে এবং সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি চীনের বাজারকে লক্ষ্য করে আলাদা রপ্তানি কৌশল প্রণয়নের পরামর্শ দেন। এ জন্য সম্ভাবনাময় ২০ থেকে ৩০টি পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর সার্টিফিকেশন, প্যাকেজিং ও বাজার উপযোগী উন্নয়নে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি চীনের প্রধান শহরগুলোতে শক্তিশালী বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের চীনা আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, সুপারমার্কেট ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজ্জাকের মতে, চীনা বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব ছাড়া চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন কঠিন। কারণ, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু পুঁজি নয়, বাজার-সম্পর্কিত জ্ঞান এবং শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্কও নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু চীনা প্রকল্পের পরিবর্তে বাংলাদেশের উচিত বিনিয়োগনির্ভর শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

এ ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে যদি বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ যুক্ত হয়।

সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী ইলেকট্রনিকস ও যন্ত্রাংশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং হালকা প্রকৌশল শিল্প।

রাজ্জাক বলেন, আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, প্রস্তুত শিল্পভূমি, দ্রুত কাস্টমস সেবা, স্থিতিশীল করনীতি, সহজ মুনাফা প্রত্যাবাসন ব্যবস্থা, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা এবং ডিজিটাল অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

 

Related Articles

Latest Posts