যেদিন সেনেগালের নৃত্যে জেগে উঠলো পৃথিবী

সবুজ গালিচায় সেদিন যা ঘটেছিল, তা হয়তো ফলাফলের খাতায় কেবলই কয়েকটি সংখ্যা। কিন্তু যারা দেখেছিল, তাদের বুকে গেঁথে আছে ভিন্ন এক মাত্রায়। ঠিক যেভাবে কোনো কবিতার একটি চরণ অকস্মাৎ কণ্ঠে এসে আটকে যায়, কিংবা যেভাবে কোনো চেনা সুর কানে এলে অনেক পুরনো একটি বিকেলের ঘ্রাণ স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে। ঠিক সেভাবেই।

পাপা বৌবা দিওপ যখন তার গায়ের জার্সিটি খুললেন, তখন সিউল মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়ামের ষাট সহস্র দর্শক যেন মুহূর্তের জন্য ঠাওর করতে পারেনি তারা আসলে কী দেখছে। পরক্ষণেই তারা উপলব্ধি করল। এরপর সকলেই উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের ছোট্ট একটি দেশ, যে দেশের নাম হয়তো অনেকেই মানচিত্রের বুকে ঠিকঠাক খুঁজে পায় না; সেই দেশটি যেন প্রথমবারের মতো অনুভব করল, পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতেও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়।

২০০২ সাল। মে মাসের শেষ দিন। কোরিয়া আর জাপান মিলে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ, ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব। এশিয়ায় প্রথমবার। আর সেই উৎসবের একদম প্রথম দিন, প্রথম ম্যাচে, ‘এ’ গ্রুপের উদ্বোধনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলো এমন দুটি দল, যাদের মধ্যকার ব্যবধান কেবল ভৌগোলিক ছিল না, ছিল বিস্তর ঐতিহাসিকও।

একদিকে ফ্রান্স। সে সময়কার ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে ত্রাসজাগানিয়া এক পরাশক্তি। ১৯৯৮ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতেছে, ২০০০ সালে জয় করেছে ইউরোপ। দলে রয়েছেন জিনেদিন জিদান, এমন এক নাম যাকে কেবল ‘ফুটবলার’ অভিধানে আবদ্ধ করা যায় না; তিনি ছিলেন এক জীবন্ত দর্শন, এক অপরূপ সৌন্দর্যবোধ, মাঠের বুকে যার হেঁটে চলার মাঝেও লুকিয়ে থাকত এক অনবদ্য ছন্দ।

পাশে থিয়েরি অঁরি; গতি ও প্রজ্ঞার যে অভাবনীয় মেলবন্ধন সচরাচর একজন মানুষের মাঝে দেখা যায় না। রবার্ট পিরেস, প্যাট্রিক ভিয়েরা, মার্সেল দেসায়ি, লিলিয়াঁ থুরাম যেন প্রতিটি নাম একেকটি জীবন্ত উপাখ্যান।

অন্যদিকে সেনেগাল। প্রথমবারের মতো পা রেখেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। দলে এমন কোনো পরিচিত নাম নেই যা ইউরোপীয় ধারাভাষ্যকারেরা সাবলীলভাবে উচ্চারণ করতে পারেন। স্কোয়াডের সিংহভাগ খেলোয়াড়ই খেলেন ফরাসি লিগের নানা ক্লাবে। এই বিচিত্র কারণেই ম্যাচটিকে অনেকে আখ্যা দিয়েছিল ‘ফ্রান্স বনাম ফ্রান্স-বি’ হিসেবে। এর মাঝে রসিকতা যতটুকু ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা।

ম্যাচের আগের রাতে দাকারের অধিবাসীদের চোখে ঘুম ছিল না। সারারাত তারা নির্ঘুম কাটিয়েছে টিভি-রেডিওর সামনে বসে। কেউ কেউ নিমগ্ন ছিল প্রার্থনায়। কেউবা সান্ত্বনার সুরে বলেছিল, ‘হারলে কোনো আক্ষেপ নেই, শুধু ভালো খেললেই হবে।’ ইউরোপের বাজির দরবারগুলোতে সেনেগালের পক্ষে কেউ বাজিও ধরেনি। এটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ পরিসংখ্যান, র‍্যাংকিং, অভিজ্ঞতা আর ইতিহাস, সবকিছুই একই সুরে কথা বলছিল। ফ্রান্স জিতবে। অনায়াসে।

তবে খেলার মাঠ তো আর পরিসংখ্যানের ধার ধারে না।

ম্যাচের শুরু থেকেই সেনেগাল বুঝিয়ে দিল যে, তারা কেবল আত্মসমর্পণ করতে আসেনি। তারা শুধু রক্ষণে কুঁকড়ে থাকেনি, বরং মাঝেমধ্যেই ফরাসি রক্ষণভাগে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছিল। তাদের ফরাসি কোচ ব্রুনো মেতসু, যিনি সেনেগালকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলেন, দলটিকে গড়ে তুলেছিলেন ভিন্ন এক আবহে। কেবল মেধা দিয়ে নয়, অগাধ বিশ্বাস দিয়ে। তিনি বলতেন, ‘ফুটবলার হওয়ার আগে তারা মানুষ। আর মানুষ হিসেবে তারা অনন্য।’

সেই অটুট বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেল মাঠে।

 

ত্রিশতম মিনিট। মাঠের বাঁ দিক থেকে বল এলো মাঝমাঠে। পাপা বৌবা দিওপ বলটা পেলেন ফরাসি বক্সের কিছুটা বাইরে। একটু এগিয়ে গেলেন। ডান দিকে একটু ঘুরলেন, যেন রক্ষকদের ভারসাম্য নষ্ট করছেন। তারপর বাঁ পা তুললেন।

যে মুহূর্তে বলটা জালে গেল, সেই মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়ামে একটা অদ্ভুত নীরবতা নামল। আধা সেকেন্ডের জন্য। তারপর ভেঙে পড়ল সব। সেনেগালের সমর্থকেরা, যারা হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিল, যারা এই মুহূর্তের কথা হয়তো স্বপ্নেও আনেনি, তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল। অনেকে কাঁদলও।

আর দিওপ?

দিওপ দৌড়ালেন না। চিৎকার করলেন না। তিনি থামলেন। জার্সি খুললেন। দুই হাত আকাশের দিকে ছড়িয়ে দিলেন। তারপর শুরু হলো সেই নাচ, সেনেগালের লোকনৃত্যের ছন্দে, কোমর দুলিয়ে, পা ফেলে, একদম নিজের মতো করে। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো আগে থেকে ভাবা ভঙ্গি নেই, শুধু একজন মানুষের ভেতর থেকে উথলে ওঠা আনন্দ, যা আর ধরে রাখা গেল না।

তার সতীর্থরা ছুটে এলেন। তারাও নাচলেন। সিউলের মাটিতে সেদিন আফ্রিকার একটুকরো উৎসব নেমেছিল, সেই উৎসব যেখানে জয় শুধু গোলের সংখ্যায় মাপা হয় না, মাপা হয় বুকের গভীরে কতটা পৌঁছাল তাই দিয়ে।

ফ্রান্সের গোলকিপার ফাবিয়েন বার্থেজ সেদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন জালের পাশে, হতভম্ব। মাঠে থাকলে জিদান হয়তো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু ইনজুরি তাঁকে সেদিন মাঠে আসতে দেয়নি। থিয়েরি অঁরি চেষ্টা করলেন, ড্রিবল করলেন, জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেনেগালের রক্ষণ আলিউ সিসে, ফার্দিনান্দ কোলো তুরে, পাপ বোউবা দিওপ যেন ইস্পাতের দেয়াল হয়ে উঠেছিল।

নব্বই মিনিট শেষ হলো। সেনেগাল ১-০ ফ্রান্স।

সেই বিশ্বকাপে সেনেগালের যাত্রা সেখানেই থামেনি। ডেনমার্ককে হারিয়ে, উরুগুয়ের সাথে ড্র করে তারা নকআউট পর্বে উঠল। শেষ ষোলোয় সুইডেনকে হারাল অতিরিক্ত সময়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের বিপক্ষে লড়ল প্রাণপণে, কিন্তু ইলহান মানসিজের গোল্ডেন গোলে স্বপ্ন থামল।

তবু যা হয়েছিল, তা থেকেই গেল।

পাপা বৌবা দিওপ পরে বলেছিলেন সেই গোলের কথা। বলেছিলেন, বলটা যখন জালে ঢুকল, তখন তিনি ভেবেছিলেন তার মায়ের কথা, তার গ্রামের কথা, সেই ছোটবেলার কথা যখন খালি পায়ে মাটির মাঠে খেলতেন। সেই মুহূর্তে জার্সি খোলা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। আর নাচ? সেটা শেখানো হয়নি। সেটা এসেছিল ভেতর থেকে। যেমন আসে, যখন কোনো কথা দিয়ে আর প্রকাশ করা যায় না।
 

Related Articles

Latest Posts