আবারও গৃহবন্দী অং সান সুচি, দাবি সেনাবাহিনীর

কারাবাস থেকে গৃহবন্দিত্ব বরণ করেছেন মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী নেতা অং সান সুচি (৮০)। এমনটাই দাবি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর। 

আজ শুক্রবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি। 

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সুচির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী।

তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন এবং প্রায় পাঁচ বছর জান্তা প্রধান হিসেবে দেশ শাসন করেন। 

সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচনের পর দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন সেই মিন অং হ্লাইং। 

তিনি বলেন, ‘(অং সান সুচি) তার দণ্ডের বাকি অংশটুকু একটি সুনির্দিষ্ট বাড়িতে গৃহবন্দী অবস্থায় কাটাবেন।’

২০১৫ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন নেতারা গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়া চালুর পর ক্ষমতায় আসেন অং সান সুচি। 

এর আগে তিনি দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। সেনা সরকারের অধীনে সে আমলে ১৫ বছরেরও বেশি সময় গৃহবন্দিত্ব বরণ করেন সুচি। 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সুচির একটি ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তার পাশে দুইজন উর্দি পরিহিত নিরাপত্তাকর্মী দেখা যায়। 

সুচির ছেলে কিম আরিস জানান, তিনি এই ঘোষণায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না। এমন কী, তিনি এমন কোনো প্রমাণও পাননি যাতে নিশ্চিত হতে পারেন যে তার মা জীবিত আছেন। 

রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের ওই ছবিকে ‘অর্থহীন’ আখ্যা দিয়ে আরিস বলেন, এটা ২০২২ সালে তোলা ছবি।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি সেনাবাহিনী যা বলছে, তা সত্য। আমি এখনো মাকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেখিনি।’

‘সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার সঙ্গে নিজে যোগাযোগ করতে না পারছি, বা কোনো মানুষ নিরপেক্ষভাবে তার পরিস্থিতি যাচাই না করতে পারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো কিছুই বিশ্বাস করব না’, যোগ করেন তিনি। 

এই ঘোষণার আগে তার স্বাস্থ্য বা কী অবস্থায় তিনি বেঁচে আছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। 

কিম আরিস গত ডিসেম্বরে দাবি করেন, মায়ের সঙ্গে গত কয়েক বছরে একবারও কথা হয়নি তার।  

সুচির আইনজীবীরা রয়টার্সকে জানান, গৃহবন্দিত্বের বিষয়ে তাদেরকে কোনো সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়নি। 

আইনজীবীদের সঙ্গে তিন বছর ধরে কোনো ধরনের দেখা সাক্ষাৎ নেই সুচির। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সর্বশেষ যোগাযোগের পর কেটে গেছে দুইটি বছর। 

বৃহস্পতিবার সুচির ছবিটি প্রকাশ পাওয়ার আগে সর্বশেষ ২০২১ সালের মে মাসে আদালতে হাজিরা দেওয়ার ছবি প্রকাশ পেয়েছিল। বিভিন্ন মামলায় শাস্তি হিসেবে সুচিকে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। 

তবে এই দণ্ড একাধিকবার কমানো হয়েছে। 

অভ্যুত্থানের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ব্রাত্য হয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ভাবে সেই ভাবমূর্তি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছেন হ্লাইং। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের আয়োজন করেন তিনি। 

একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবার সুচিকে আংশিকভাবে কারাদণ্ড থেকে মুক্তি দিতে পারেন হ্লাইং—এমন মত অনেকের। 

সেনা সমর্থিত দলের বিপুল ব্যবধানে জয়, সুচির দলসহ অন্যান্য জনপ্রিয় বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ডে নির্বাচনের আয়োজন না করাসহ আরও বেশ কয়েকটি কারণে এই ভোট আন্তর্জাতিক মহলের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

বিশ্লেষকরা সমালোচনা করে বলেন, বিশ্ববাসীর চোখে ধুলো দেওয়ার প্রচেষ্টার এই নির্বাচনের বৈধতা নেই বললেই চলে। এটি কাগজেকলমে সেনা শাসনকে গণতন্ত্র হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ—এমনটাও বলেছেন অনেকে।  

অং সান সুচির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা শন টারনেল বিবিসিকে বলেন, ‘মিয়ানমার শাসন করছে সামরিক শাসকরা। তারা এ মুহূর্তে জনসংযোগের দিক দিয়ে তোপের মুখে আছে।’

‘তারা বিশ্বকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা বৈধ সরকার গঠন করেছে। অং সান সুচিকে কারাগার থেকে বাড়িতে স্থানান্তরের ঘোষণা হচ্ছে সেই উদ্যোগের অত্যাবশ্যক অংশ’, যোগ করেন তিনি। 

টারনেল বলেন, ‘আশা করছি খবরটা সত্য। তবে এর সত্যতা নিয়ে আমি সন্দিহান’। 

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সুচির সরকারের অন্যান্য নেতাদের পাশাপাশি অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ টারনেলও আটক হন।

Related Articles

Latest Posts