অভ্যন্তরীণ চার বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা কমছে। কারণ, সড়কপথে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং ফ্লাইটের তুলনায় ভাড়া কম হওয়ায় অনেক যাত্রী এখন সড়কপথে ভ্রমণ করছেন।
গত অন্তত দুই বছর ধরে বরিশাল, যশোর, রাজশাহী ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা কমছে। তবে দেশের অন্য চারটি বিমানবন্দর—ঢাকার শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরে গত অর্থবছরে যাত্রী সংখ্যায় কিছুটা উন্নতির দেখা মিলেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে যাত্রী কমেছে সবচেয়ে বেশি, তারপরেই রয়েছে বরিশালের অবস্থান। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে এই দুই গন্তব্যে সড়কপথে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় যাত্রীরা আকাশপথ থেকে সড়কপথের দিকে ঝুঁকেছেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দরে ২ লাখ ২১ হাজার যাত্রী চলাচল করলেও দুই বছর পর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৯২ হাজার ২০০-তে। এ ছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৪ হাজার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
২০২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার। এর দুই বছর পরেই সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে যাত্রী সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশ কমে মাত্র ৮ হাজার ৭০০-তে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহীর শাহ মখদুম এবং সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাত্রী কমার হার বরিশাল ও যশোরের তুলনায় কিছুটা কম। দুই বছর আগেও রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে বছরে দেড় লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করতেন। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সেই সংখ্যা কমে ৮২ হাজার ২০০-তে নেমেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম।
উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর বিমানবন্দরেও যাত্রী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সেখানে ৩ লাখেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম।
দেশের নতুন বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা এয়ার অ্যাস্ট্রার চিফ কমার্শিয়াল অফিসার (সিসিও) মেসবাহ-উল ইসলাম বলেন, অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো ফ্লাইট ভাড়া বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন গন্তব্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
তিনি আরও বলেন, ‘এর আরেকটি বড় কারণ হলো কিছু রুট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বরিশাল রুটে যাত্রী প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এই রুটটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অন্যদিকে, আগে যশোর একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য থাকলেও বর্তমানে সেখানে দিনে মাত্র এক-দুটি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।’
তিনি পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সড়ক যোগাযোগে আসা উন্নতির বিষয়টি উল্লেখ করে এসব কথা বলেন।
মেসবাহ-উল ইসলাম জানান, যশোর রুটে একসময় উড়োজাহাজের আসন পূর্ণ থাকত (১০০ শতাংশ যাত্রী), যা এখন নেমে এসেছে প্রায় ১০ শতাংশে। বরিশাল রুট প্রায় বন্ধ এবং যশোরে ফ্লাইট সংখ্যা ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসায় সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ যাত্রী সংখ্যায় বড় প্রভাব পড়েছে।
তার মতে, উত্তরাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে সৈয়দপুর রুটেও যাত্রী সংখ্যা কমেছে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে মোট ১ কোটি ৫৮ লাখেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন।
এর মধ্যে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি যাত্রী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া, ৯ শতাংশ যাত্রী ব্যবহার করেছেন চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর পরেই রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবস্থান।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী সংখ্যা মোটামুটি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তারা বর্তমানে সিলেটে অতিরিক্ত একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছেন।
দেশের বৃহত্তম এই বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থাটি যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়ায় সৈয়দপুর রুটে ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।
কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সৈয়দপুর রুটে যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমাদের ফ্লাইটের সংখ্যা এবং আসন সক্ষমতা কমাতে হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, রাজশাহী রুটে ইউএস-বাংলা প্রায় দেড় মাস ফ্লাইট বন্ধ রেখেছিল। তবে বর্তমানে পুনরায় অপারেশন শুরু করেছে এবং সপ্তাহে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
কামরুল উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি সব রুটে এক রকম নয় এবং দেশের সব অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী সংখ্যা কমেনি।
‘উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজার রুটে যাত্রী চাহিদা বেশি থাকায় আমরা সেখানে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়িয়েছি। শুধু ইউএস-বাংলা নয়, এয়ার অ্যাস্ট্রাও এই রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়িয়েছে,’ বলেন তিনি।
ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এয়ারলাইনটি অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য উপযোগী ছোট আকারের উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার কথা ভাবছে, যেন ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো যায়।
এয়ার অ্যাস্ট্রার মেসবাহ-উল ইসলাম জানান, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য সত্ত্বেও এয়ারলাইনগুলো ভাড়া কম রাখার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ‘জেট ফুয়েলের দাম এখন প্রতি ব্যারেল ১৬৫ থেকে ১৬৬ ডলার। তবুও আমরা ভাড়া বাড়াচ্ছি না। কক্সবাজার রুটে আগে সর্বোচ্চ ভাড়া ছিল ৬ হাজার ৩০০ টাকা, যা এখন কমে ৪ হাজার ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে। যাত্রী ধরে রাখতে এবং যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির চেষ্টায় আমরা লোকসান দিয়েও ভাড়া কম রাখছি।’

