যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো আবারও সচল করেছে ইরান। একইসঙ্গে ড্রোন উৎপাদনও শুরু করেছে এবং লঞ্চারের সক্ষমতাও ফিরিয়ে এনেছে দেশটি।
স্যাটেলাইট ছবি ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের বরাতে আজ রোববার এসব তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, একেবারেই সাধারণ কিছু যন্ত্রপাতি যেমন, বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে ধ্বংস হওয়া টানেল বা সুরঙ্গের মুখ খুলে ফেলেছে ইরান।
আর এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোটি কোটি ডলারের আধুনিক বোমা হামলাকে অনেকটা ব্যর্থ প্রমাণিত করেছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ইরানের এই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশলের বড় সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। একইসঙ্গে কেবল সুড়ঙ্গের মুখ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব নয় বলেও প্রমাণিত হয়েছে।
জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর পিস রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি পলিসির গবেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, এ ধরনের ক্ষতি করতে অত্যাধুনিক ও দামী অস্ত্র লাগে, আর পুনরুদ্ধার করতে লাগে শুধু বুলডোজার।
স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে সিএনএন জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের অন্তত ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ৬৯টি টানেল মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে ইতোমধ্যে ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে অন্তত ৫০টি টানেলের মুখ সচল করেছে দেশটি। অনেক স্থানে বোমার আঘাতে তৈরি হওয়া গর্ত ভরাট করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কও নতুন করে পাকা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের সময় টানেলের মুখ খুঁড়ে ঘাঁটিগুলো চালু করতে অনেক বড় ঝুঁকি নিতে হয়েছে ইরানকে। সে সময় খননযন্ত্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও কাজ থামায়নি তারা। এরপর সাত সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধবিরতির সময় পুনরুদ্ধারের কাজ আরও জোরালো করেছে দেশটি।
স্যাটেলাইট ছবির বরাতে সিএনএন জানায়, ইসফাহানের কাছে একটি ঘাঁটিতে একাধিক টানেলের মুখ বন্ধ করতে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
شكوك من ادعاءات ترامب.. صور أقمار صناعية تُظهر #إيران تستعيد حالياً إمكانية الوصول إلى كميات هائلة من الصواريخ المخزنة في منشآتها تحت الأرض https://t.co/rf2nCch8AX
— CNN بالعربية (@cnnarabic) May 31, 2026
কিন্তু মে মাসের শুরুতেই সেখানে ডাম্প ট্রাক দিয়ে গর্ত ভরাট ও দুটি সড়ক মেরামত করে ইরান।
এ ছাড়া খোমেইন এলাকায় একটি ঘাঁটি পুনরায় চালু করতে একসঙ্গে অন্তত ১০টি ডাম্প ট্রাককে কাজ করতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ এ হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার পুরোপুরি ধ্বংস করা।
মার্চ মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, যুদ্ধের প্রধান পাঁচটি লক্ষ্যের মধ্যে একটি হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড়ের গভীরে এই ঘাঁটিগুলো গড়ে তুলেছে ইরান। কিছু স্থাপনা কয়েকশ মিটার পাথরের নিচে, যা সরাসরি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তাই যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল টানেলের মুখ ও সড়ক লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এতে সাময়িকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে আসে।
ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, মাটির নিচে থাকা প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। অতীতেও এ ধরনের হামলার পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইরান।
🚨⚡ BIG NEWS:
🇮🇷 Iran reportedly has over 1,000 missiles hidden inside underground facilities and fortified missile bases. 🚀🔥
Tehran’s strategic arsenal remains a major force in the region. pic.twitter.com/rhzQ8ncq1o
— IRAN IRGCC (@IranIRGCC) May 31, 2026
গবেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, তারা ২০ বছর ধরে এমন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা খুবই প্রস্তুত।
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। বলেন, বিশেষ করে যখন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুদ কমে আসছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মতে, ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনরায় শুরু করেছে। লঞ্চার উৎপাদন সক্ষমতাও ফিরিয়ে এনেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমাদের নির্ধারিত সময়সীমার চেয়েও দ্রুত পুনর্গঠন করছে ইরান।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে আবারও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হলেও, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে।
এমন প্রেক্ষাপটে সংঘাত ফের শুরু হলে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া অব্যাহত রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণা সংস্থা জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার সিএনএনকে বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র এখনও ইরানের কাছে মজুত রয়েছে। লঞ্চার থাকলে হামলা চালানো কঠিন কিছু নয়।
তিনি আরও বলেন, যতক্ষণ লঞ্চার ও প্রশিক্ষিত ক্রু থাকবে, ততক্ষণ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে বাধা নেই।
তবে এ বিষয়ে সিএনএনের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দেননি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল।

