প্রায় এক মাস যুদ্ধ বন্ধ থাকার পর গত রোববার আবারও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে ইরান গত দুই দিনে এ অঞ্চলের পাঁচটি ভিন্ন অবস্থানে মার্কিন সেনা ও অবকাঠামোর ওপর হামলা চালায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার ইরান কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে গত মঙ্গলবার উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা চালায় ওয়াশিংটন। ওই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে তেহরান।
বেসামরিক মানুষের ওপর সরাসরি হামলার দায় স্বীকার না করলেও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওই হামলার ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া নতুন সংঘাত ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অচলাবস্থা আরও গভীর করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরান নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে পাল্টা অবরোধ আরও জোরদার করছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা আহমদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে’ হামলা চালিয়েছে।
কুয়েত এসব হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তবে আমিরাতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য আসেনি।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে দেশটির উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০ জনের বেশি।
ভ্যান্স বলেছেন, ওয়াশিংটন এই হামলার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে।
তবে ইরানের দাবির বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আমরা ঘটনাটি তদন্ত করছি।’
‘আমি বলব, এ পর্যন্ত সংঘাতে কী ঘটেছে, তা নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম খুব নির্ভরযোগ্য বিবরণ দেয়নি। তাই এ বিষয়ে আমি অত্যন্ত সন্দিহান,’ যোগ করেন তিনি।
ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান আহমাদ ভাহিদি গতকাল বৃহস্পতিবার হামলায় নিহতদের প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘এসব নির্যাতিত শহীদদের রক্তপাত বিফলে যেতে দেওয়া হবে না’।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স মন্তব্য করেন, ‘আইআরজিসি বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে অভ্যস্ত হলেও মার্কিন সেনাবাহিনী কখনোই এমন করবে না।’
মঙ্গলবার থেকে বুধবারের মধ্যে ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বোমাবর্ষণে অন্তত ১৯ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকির সুরে বলেন, তার সামরিক বাহিনী ‘যখন খুশি তখনই ইরানে হামলা চালাতে পারে।’
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির নৌবাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। তবে এই ছয়জন আগের উল্লেখ করা ১৯ নিহতের মধ্যে রয়েছেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
তেহরান এ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে। ইরান বলেছে, তারা আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও বাহিনীকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালিয়েছে।
তবে ভ্যান্স বলেছেন, তিনি এটিকে ‘যুদ্ধ বলবেন না’।
তিনি দাবি করেন, ‘এই মুহূর্তে সক্রিয়ভাবে কোনো গোলাগুলি চলছে না।’ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেন, ‘কিছু জায়গায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে’।
তবে তিনি দাবি করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বড় ধরনের সামরিক অভিযান মাত্র ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাই বুধবার যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধে ইরান একটি ‘নতুন কৌশল’ গ্রহণ করেছে, যা ‘আমেরিকানদের ভিত গুঁড়িয়ে দেবে’।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর জুলাইয়ে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এর আগে এই প্রণালি দিয়ে যেত।
বর্তমানে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নেই বললেই চলে।

