জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ এনে বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট আমদানির সিংহভাগই আসে এই দেশগুলো থেকে। বিবিসির খবরে এমনটি জানানো হয়েছে।
এসব দেশের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসছে। তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান ও ভারতের মতো দেশ।
এর আগে বিদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১০ শতাংশ হারে যে সাময়িক শুল্ক আরোপ করেছিল, তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপরই আজ শুক্রবার থেকে নতুন এই বর্ধিত শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফেরার পর যে বিশ্ব বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, এই পদক্ষেপ তাকে আরও উসকে দিল।
এর আগে জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি যে শুল্কগুলো বসিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট সেগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকেই প্রেসিডেন্ট তার বাণিজ্যিক লক্ষ্য পূরণে নতুন নতুন উপায় খুঁজছিলেন।
জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে গত মাসে কয়েক ডজন দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল হোয়াইট হাউস।
বৃহস্পতিবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় সেই শুল্ক এখন কার্যকর করা হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে গ্রিয়ার বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থারও পরিবর্তন ঘটবে। এটি বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের কল্যাণে সহায়ক হবে।
গ্রিয়ার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা প্রয়োগের কথা উল্লেখ করেন। আইনটি মার্কিন বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে এমন যেকোনো চর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয় যুক্তরাষ্ট্রকে।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারা ব্যবহার করে কানাডার ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় থেকে জানানো হয়, যেসব দেশ জবরদস্তিমূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কার্যকর নিষেধাজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের ওপরই এই নতুন শুল্ক চাপানো হয়েছে। এই পদক্ষেপের আওতায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ। যুক্তরাষ্ট্র মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশই এসব দেশ থেকে করে।
বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় আরও জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এখন পর্যন্ত ১০টি দেশ তাদের চুক্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক তদন্তের মুখে আরও কয়েকটি দেশ নিজস্বভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেছে।
মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর জানিয়েছে, তদন্তাধীন যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, অথবা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিংবা এমন কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে করেছে যার মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমের নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি ঠেকানো যায়— সেসব দেশের ক্ষেত্রে শুল্কের হার হবে ১০ শতাংশ।
এই দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং যুক্তরাজ্য।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, কোরিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের (যেগুলো বিশেষ ছাড় পায়নি) ক্ষেত্রে এই শুল্কের হার হবে ১০ শতাংশ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ (এমএফএন হারের অতিরিক্ত), যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ফেডারেল রেজিস্টার নোটিশে দেওয়া আছে।
এ ছাড়া, এই তালিকার বাইরে থাকা তদন্তের আওতাভুক্ত অন্যান্য সব দেশের জন্য এই শুল্কের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ডেবোরা এলমস মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের শুল্ক নীতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বিবিসিকে বলেন, দেশগুলোর পক্ষে এটি প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে যে তাদের দেশে জবরদস্তিমূলক শ্রমের কোনো ব্যবহার নেই।
অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞ ওয়েন্ডি কাটলার সতর্ক করে বলেছেন, এই শুল্কের ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়তে পারে। এর ফলে অনেক দেশ আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর কথা চিন্তা করতে পারে।

