স্পিকার আজ দেশে ফিরলে পদত্যাগপত্র দিতে পারেন রাষ্ট্রপতি

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশ থেকে ফিরলেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন। আজ শুক্রবার হাফিজ উদ্দিনের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ডেইলি স্টারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

পদত্যাগ করছেন কি না, জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেখতে পাবেন…প্রশ্নটা বিব্রতকর।’

বঙ্গভবনের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটি সত্য। তবে কবে পদত্যাগ করবেন, তা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে স্পিকার দেশের বাইরে রয়েছেন। আগে তিনি দেশে আসুক। স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে।

বঙ্গভবনের আরেকটি সূত্র ডেইলি স্টারকে জানায়, স্পিকার দেশে ফেরার পর শুক্রবারই তার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হবে। সময় পাওয়া গেলে সন্ধ্যার মধ্যেই তার কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হতে পারে।

এদিকে, চিকিৎসার জন্য বর্তমানে থাইল্যান্ডে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শুক্রবার দুপুরে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন। তাকে বহনকারী থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটটি শুক্রবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণের কথা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ডেইলি স্টারকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি সূত্রের বরাতে বৃহস্পতিবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আজ পদত্যাগ করবেন।

সূত্রগুলোর মধ্যে দুজন রয়টার্সকে বলেছেন, গত মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে জানান। আজ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।

বিএনপির সূত্রগুলো ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে, চলতি বছরের ৯ থেকে ১৮ মে চিকিৎসার জন্য লন্ডন সফরে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি টেলিফোনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন।  

সূত্রগুলো জানায়, ওই ফোনালাপের বিষয়ে জানার পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বার্তা দেয়। পদত্যাগের কারণ হিসেবে সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত বিষয় উল্লেখ করতে পারেন।

তবে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, সম্ভাব্য পদত্যাগের পেছনে শুধু ওই ফোনালাপই কারণ নয়, বিষয়টা ‘আরও জটিল’।

ওই নেতার মতে, শেখ হাসিনা সম্প্রতি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক বছর পূর্তির দুই সপ্তাহ আগে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, তার দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ও পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের পরও তিনি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না, জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’

তিনি আরও বলেন, ‘তখন আমি প্রায় মৃত্যুশয্যায় ছিলাম। লন্ডনে আমি খুবই অসুস্থ ছিলাম। চিকিৎসাধীন ছিলাম। এসব ভিত্তিহীন। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি। এটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া।’

বৃহস্পতিবার এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, সাহাবুদ্দিন ও শেখ হাসিনার ফোনালাপ সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

তবে এ বিষয়ে কোনো তথ্য সামনে এলে সরকার বিষয়টি তদন্ত করবে বলে জানান তিনি। ইউএনবির প্রতিবেদনে এ তথ্য বলা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কারণে বা অন্য যেকোনো কারণে পদত্যাগ করতে চান, সংবিধান তাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’

সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন।

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠিয়ে পদত্যাগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে, অথবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া বা বর্তমান রাষ্ট্রপতি পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কোনো সচিব বা অন্য কোনো অনুমোদিত কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছে দেবেন। স্পিকার চিঠিটি গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গেই পদত্যাগ কার্যকর হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্পিকার পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করবেন।’

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর প্রায় তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন করেছেন সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদের এখনো এক বছর নয় মাস বাকি রয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনে জয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, আর সরকার যদি তার বিদায় চায়, তবে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।

 

 

Related Articles

Latest Posts