জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও ক্ষমতায় থাকাকালে জাতীয় সম্পদ লুটপাটের অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবি করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
জবাবে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির আত্মসমর্পণের সুযোগ নেই। দণ্ডিত ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রবেশ করলেই তাকে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা হবে।
আজ মঙ্গলবার রাতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে নোটিশ তোলেন রংপুর-৪ আসনে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং গণহত্যার বিচার সম্পর্কিত এ আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আখতার বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে প্রসিকিউশন টিম, আদালত ও ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো এবং আরও তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হোক।’
সারা দেশে শত শত মামলা হলেও এখনো কোনো মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল এবং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দলটিকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’
‘আওয়ামী লীগ এ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে, গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়েছে এবং জাতীয় সম্পদ লুট করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে,’ যোগ করেন নাহিদ।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মীদের কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না। তাদের ভুলে যাওয়া মানে নিজের আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। বিচার নিয়ে কোনো ধরনের বিলম্ব জাতি মেনে নেবে না।’
শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সীমান্তে একের পর এক উসকানিমূলক ঘটনা ঘটলেও সরকার নীরব রয়েছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একটি প্রবাদ আছে—“আপনি স্ত্রী বদলাতে পারেন, কিন্তু প্রতিবেশী বদলাতে পারবেন না”। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা, সম্মান ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও অন্যান্য সহযোগিতাও সেই ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।’
নিজেদের চার মাসের সময়কালে কোনো পুশ-ইন হতে দেওয়া হয়নি বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার দাবির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত আমরা তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য চাপ দিয়ে আসছি। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় আমরা তার প্রত্যর্পণ দাবি করছি, যাতে তিনি বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।’
গণঅভ্যুত্থানের মামলা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত দল ও লজিস্টিক সহায়তা আরও বাড়ানো হবে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য এই দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।’
‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার বাইরে দণ্ডবিধির আওতায় বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক মামলা চলছে। সেসব মামলারও বিচার সম্পন্ন হবে,’ বলেন তিনি।
সবাইকে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করার, তবে সেটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৬টি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, চারটি মামলায় অভিযোগ গঠন হয়েছে এবং তিনটি মামলার রায় হয়েছে।’
তিনি জানান, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে। এছাড়া সারা দেশের জেলা পর্যায়ে জুলাই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
‘দিল্লি থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছে আত্মসমর্পণ হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। দণ্ডিত অপরাধীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাত্রই গ্রেপ্তার হবে। এটাই সরকারের অঙ্গীকার,’ বলেন আইনমন্ত্রী।

