নির্বিষ ফ্রান্সকে অনায়াসে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

ম্যাচের আগে যে জমজমাট লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল, তার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাওয়া গেল না। নির্বিষ ফ্রান্সকে পুরোটা সময় স্রেফ নাচিয়ে ছাড়ল স্পেন। দুই অর্ধে একবার করে জাল কাঁপিয়ে দুর্দান্ত জয় তুলে নিল কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। অসাধারণ পারফরম্যান্সে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখল লা রোহারা।

ডালাসে মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ আসরের প্রথম সেমিফাইনালে কোনো পাত্তাই পায়নি দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। তাদেরকে অনায়াসে ২-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছে স্পেন। প্রথমার্ধে সফল পেনাল্টি থেকে মিকেল ওইয়ারজাবালের লক্ষ্যভেদে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্যবধান বাড়ান পেদ্রো পোরো।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠল স্পেন। এর আগে একবারই তারা শিরোপা নির্ধারিত মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছিল— ২০১০ সালে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সেবার অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন। এরপর গত তিনটি বিশ্বকাপে তারা হয়েছিল চরম ব্যর্থ। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার পর ২০১৮ ও ২০২২ সালে থেমেছিল শেষ ষোলোতে। সেই বৃত্ত ভেঙে শিরোপা থেকে এখন মাত্র এক ধাপ দূরে তারা।

অন্যদিকে, কিলিয়ান এমবাপে-মাইকেল ওলিসে-উসমান দেম্বেলেদের মতো আক্রমণভাগের তারকাদের নিয়ে গড়া ফ্রান্স কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই জমাতে পারেনি। মাঝমাঠ থেকেও তারা তেমন সমর্থন পাননি। ফলে প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।

সেমিফাইনাল পর্যন্ত গোলবন্যা বইয়ে দিয়ে টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নামে ফ্রান্স। কিন্তু নিখুঁত ছক কষে তাদের আক্রমণভাগকে পুরোপুরি অচল করে দেয় স্পেন। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে আগের দুই দেখায় অপরাজিত থাকা দলটি ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। মাঠের লড়াইয়ে তারা ঠিক সেটাই করে দেখায়।

মাঝমাঠে রদ্রি ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর তাকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমো। স্পেনের এই ত্রয়ী বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে প্রতিপক্ষকে কোনো ছন্দই গড়তে দেয়নি। মাঝমাঠে স্পেনের খেলোয়াড়দের আধিক্যের বিপরীতে আদ্রিয়েন রাবিও ও আহেলিয়া চুয়ামেনিকে নিয়ে গড়া ফ্রান্সের দুই সদস্যের মাঝমাঠ স্রেফ খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।

শুরুতে অবশ্য পাল্টা আক্রমণে ভীতি ছড়ানোর চেষ্টা করে ফ্রান্স। ম্যাচের ১৬তম মিনিটে তারা প্রায় এগিয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু এমবাপে যখন গোলমুখে বল নিয়ে বিপজ্জনকভাবে ছুটছিলেন, ঠিক তখনই পাউ কুবারসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্লক করে বিপদ সামলান।

স্পেনের তৈরি করা মুহুর্মুহু চাপের ফল আসে ঠিক চার মিনিট পরই। মার্ক কুকুরেয়ার ক্রস ফরাসি রক্ষণভাগের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তখন ডি-বক্সের ভেতরে লামিনে ইয়ামালকে ফাউল করে বসেন ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে। রেফারি কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট-কিক থেকে গোলরক্ষক মাইক মিনিয়ঁকে ঠাণ্ডা মাথায় পরাস্ত করে স্পেনকে এগিয়ে নেন ওইয়ারজাবাল।

৩১তম মিনিটে ফ্রান্সের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া। তাদের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন।

প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার ঠিক আগে স্পেন ব্যবধান দ্বিগুণ করার দারুণ একটি সুযোগ পায়। চমৎকার পাসিং ফুটবলে তারা ফরাসি রক্ষণকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেও বাধা হয়ে দাঁড়ান দায়োত উপামেকানো। তিনি বল ঠেকিয়ে রুইজকে গোলবঞ্চিত করেন।

দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই গতবারের রানার্সআপদের ঘুরে দাঁড়ানোর সমস্ত আশা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কারণ, স্পেন আবারও ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। ৫৮তম মিনিটে তাদের দ্বিতীয় গোলটি ছিল দৃষ্টিনন্দন আক্রমণাত্মক ফুটবলের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। ওলমোর সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে পোরো ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন। এরপর কোণাকুণি শটে আগুয়ান মিনিয়ঁর মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।

কিছুক্ষণ পরই ইয়ামাল বল জালে জড়ালে স্পেন হয়তো ভেবেছিল, তারা তৃতীয় গোলটিও পেয়ে গেছে। কিন্তু খুব সূক্ষ্ম অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশম পরপর কয়েকটি পরিবর্তন আনেন। মাঠে নামেন দিজিরে দুয়ে ও রায়ান চেরকির মতো তারকারা। তবে স্পেনের সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগের সামনে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বরাবরই হতাশ হতে হয়। ব্যবধান কমানোর সবচেয়ে ভালো সুযোগটি এমবাপে পেলেও তার নেওয়া শটটি কাছের পোস্টে দারুণ ক্ষিপ্রতায় রুখে দেন সিমন।

ম্যাচের শেষদিকে সিমনের সাথে বলের দখল নিতে গিয়ে বিপজ্জনক ট্যাকল করে বসেন এমবাপে। ফলে হলুদ কার্ড দেখতে হয় তাকে। সব মিলিয়ে ফ্রান্সের জন্য এটি ছিল অনেক আশা জাগানিয়া এক অভিযানের করুণ সমাপ্তি। অন্যদিকে, অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে বাকি সময়টুকু পার করে দিয়ে স্পেন মাঠ ছাড়ে জয়ের আনন্দ নিয়ে।

এই নিয়ে টানা তিনটি সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারাল স্পেন। এর আগে ২০২৪ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২০২৫ সালের উয়েফা নেশন্স লিগে জিতেছিল তারা। আগামী রোববার রাতে নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে আর্জেন্টিনা বা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে দলটি।

Related Articles

Latest Posts