সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো গুজব, অপতথ্য বা মিথ্যা তথ্যের যাচাই এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক তথ্য প্রচার করবে নবগঠিত সাইবার পুলিশ ইউনিট। থানাপর্যন্ত বিস্তৃত দেশব্যাপী কাঠামোর মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এছাড়া সাইবার ও আর্থিক অপরাধের তদন্ত, ডিজিটাল প্রমাণ ও সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও বিশ্লেষণ, ডার্ক ওয়েব পর্যবেক্ষণ এবং অনলাইনে নারী ও শিশুদের হয়রানি থেকে সুরক্ষার কাজও করবে বিশেষায়িত এই ইউনিট। পাশাপাশি চালু করবে ২৪ ঘণ্টার সাইবার সহায়তা কেন্দ্র।
পুলিশ সদর দপ্তরে গতকাল বৃহস্পতিবার ইউনিটটির উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসময় তিনি জানান, কয়েক মাসের পরিকল্পনার পর ইউনিটটির সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে।
একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ইউনিটটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর সদর দপ্তর হবে ঢাকায়। বিভাগীয় পর্যায়ে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপাররা (এসপি) কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকবেন।
অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, ইউনিটটির জন্য মোট ৪ হাজার ৫৯২টি পদ রাখা হয়েছে।
সাংগঠনিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করা তথ্য ও অপতথ্য কখনো কখনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ছড়ানো হয়। ‘ফ্যাক্ট চেক ও কাউন্টার ন্যারেটিভ’ কার্যক্রমের আওতায় ইউনিটটি এসব তথ্য যাচাই করবে। প্রয়োজন হলে নথি অনুসারে সঠিক তথ্য ব্যবহার করে পাল্টা বক্তব্যও প্রচার করবে।
তবে কোন মানদণ্ডে এ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, তার বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইউনিটের একটি বিশেষায়িত শাখা সামাজিকমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্স পর্যবেক্ষণ করবে। এ শাখার কাজ হবে গুজব, অপতথ্য, উসকানিমূলক প্রচারণা এবং সাইবার হুমকি শনাক্ত করা। এ জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও উন্মুক্ত উৎসের তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ব্যবহার করে প্রতারণা এবং ফিশিংসহ প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক অপরাধও তদন্ত করবে ইউনিটটির আরেকটি শাখা।
অনলাইন বেটিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিসংক্রান্ত অপরাধ এবং ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ তদন্তের জন্যও পৃথক ইউনিট থাকবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ভিডিও বিশ্লেষণ এবং মুখ শনাক্তকরণ সফটওয়্যারের সাহায্যে টেলিভিশন, অনলাইন, সরাসরি সম্প্রচার ও সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হবে।
এছাড়া সাইবার টহল, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, হুমকি বিশ্লেষণ, এথিক্যাল হ্যাকিং এবং প্রযুক্তিগত দুর্বলতা শনাক্ত করার কাজও করবে ইউনিটটি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি থানায় পর্যায়ক্রমে সাইবার ডেস্ক চালু করা হবে। প্রতিটি ডেস্কে থাকবেন দুই থেকে তিনজন প্রশিক্ষিত সাইবার তদন্ত কর্মকর্তা এবং দুই থেকে তিনজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)। তারা প্রাথমিকভাবে সাইবার অপরাধের অভিযোগে সাড়া দেওয়া ও তদন্তের দায়িত্ব পালন করবেন।
মহানগর (মেট্রোপলিটন), বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও পৃথক বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট থাকবে।
প্রস্তাবিত ২৪ ঘণ্টার সাইবার সহায়তা কেন্দ্র থেকে শর্ট কোড, কল সেন্টার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইমেইলের মাধ্যমে সেবা ও আইনি পরামর্শ দেওয়া হবে। কেন্দ্রটির হটলাইন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
মোট ৪ হাজার ৫৯২টি পদের মধ্যে ৪ হাজার ৩৬৩টি পুলিশ সদস্যদের জন্য। বাকিগুলোর মধ্যে ১২৫টি বেসামরিক কারিগরি কর্মী এবং ১০৪টি পদ অন্যান্য বেসামরিক কর্মীর জন্য রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সিস্টেম অ্যানালিস্ট, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষক, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ম্যালওয়্যার বিশ্লেষক, ডার্ক ওয়েব বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষকদের পৃথক বেতন কাঠামোয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার আগে বিদ্যমান পুলিশ সদস্যদের মধ্য থেকে যত বেশি সম্ভব পদ পূরণের উদ্যোগ নেবে সরকার।’
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন হালনাগাদ করা হচ্ছে। এতে সাইবার অপরাধগুলো আরও সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে।’
প্রস্তাবে ইউনিটটির জন্য ২ হাজার ৬৭টি যানবাহনের চাহিদা রাখা হয়েছে। বার্ষিক নিয়মিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৪৭ কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৩৪ টাকা এবং এককালীন অনিয়মিত ব্যয় ৫৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯২ টাকা।
সব মিলিয়ে পুলিশের সাইবার ইউনিটের জন্য মোট ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে ৪৪৭ কোটি ৬৯ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৬ টাকা।
অবশ্য যানবাহন কেনার জন্য কী পরিমাণ ব্যয় করা হবে, তা নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।

