চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, তখন ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহের ছেলে রেজা পাহলভির সামনে যেন এসে হাজির হয়েছিল এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ইরানে পা না রাখলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে সক্রিয় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছিলেন পাহলভি। মাতৃভূমির উজ্জ্বল নতুন ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, অর্থ সংগ্রহ করছিলেন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি ঘোষণা দেন, ‘ইরানের জনগণ আমাকে আহ্বান জানিয়েছে, এই শাসনের পতনের পর যেন আমি অন্তর্বর্তী সময়ে নেতৃত্ব দিই। আমি সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’
মার্চে টেক্সাসে কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে (সিপ্যাক) সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনাগুলোর একটি পান পাহলভি। মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক ও বিপুলসংখ্যক ইরানি-আমেরিকান তাকে ৪৫ সেকেন্ড ধরে দাঁড়িয়ে করতালি দেন। তাদের অনেকের গায়ে জড়ানো ছিল বিপ্লব-পূর্ব ইরানের সেই পতাকা, যা তার বাবার শাসনামলে ব্যবহৃত হতো।
চার দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের একটি ঘোষণা বহু ইরানি প্রবাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে। তিনি লেখেন, ‘আমরা ইরানকে বিস্ফোরণে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি অথবা, যেমন বলা হয়, প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দিচ্ছি!!!’
পাহলভির ইরানি-আমেরিকান আর্থিক সমর্থকদের কেউ কেউ এতে হতবাক হন। তাদের একজন রয়টার্সকে জানান, দাতারা সম্প্রতি পাহলভির প্রচারে ৩০ লাখ ডলারের বেশি দিয়েছিলেন—এই আশায় যে তিনি ইরানে নতুন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারবেন। কিন্তু ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের দ্রুত নিন্দা করেননি নির্বাসিত এই যুবরাজ।
কীভাবে ইরানের পরবর্তী নেতা হওয়ার দৌড় থেকে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি পিছিয়ে পড়লেন, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন সিপ্যাকে পাহলভির সেই বিজয়ীর মতো উপস্থিতিকেই তার উত্থানের চূড়া বলে মনে হচ্ছে। কট্টরপন্থী ইসলামি সরকারের পতন হলে যারা ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণ করতে চান, তাদের মধ্যে সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রার্থী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। প্রচার এখনো চালিয়ে গেলেও তার নেতৃত্বের প্রচেষ্টা হোঁচট খেয়েছে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি ট্রাম্প রয়টার্সকে বলেন, পাহলভিকে ‘খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়, কিন্তু নিজের দেশে তিনি কেমন করবেন, আমি জানি না।’ আড়ালে তার প্রশাসনও যুবরাজকে পাশে সরিয়ে দেয়।
জানুয়ারির শুরুতে তেহরানে বিক্ষোভের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন নিয়ে ১৫ জানুয়ারি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইরানি-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী আহমাদ বাতেবি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন রয়টার্সকে জানান, জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ব্যক্তিগতভাবে বাতেবিকে পাহলভির নাম উল্লেখ না করার অনুরোধ করেছিলেন। পাহলভির সমর্থক হলেও সেই অনুরোধ মেনে নেন আহমাদ বাতেবি।
মাইক ওয়াল্টজ রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, বিরোধী রাজনীতি নিয়ে পড়ে না থেকে ইরানের জেলে বাতেবির নিজস্ব নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ও সরকারের বর্বরতাই মূল আলোচনায় থাকা উচিত। এই বিষয়গুলোর ওপর নজর দিলেই তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সই করা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে শাসন পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে সম্মত হয়। এতে প্রকাশ্যে আবারও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন পাহলভি।
১৪ জুন ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক ঘোষণার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পডকাস্টার মেগিন কেলিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কখনো বলেননি যে, তার লক্ষ্য রেজা পাহলভিকে বসিয়ে ইরানের নতুন নেতা বানানো।’
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই চুক্তির সমালোচনা করা ছাড়া পাহলভি ও তার শীর্ষ সহযোগীদের হাতে আর তেমন কিছু ছিল না।
এদিকে ব্যক্তিগত একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ রাখা পাহলভির কিছু আর্থিক সমর্থকও হতাশ হয়ে পড়েছেন।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত কথোপকথনে পাওয়া পরামর্শগুলো পাহলভি শেষ পর্যন্ত উপেক্ষা করেছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা এবং নিজের উগ্র সমর্থকদের সহিংস আচরণের কড়া সমালোচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তাকে। যদিও এসব হামলার পেছনে পাহলভির নিজের কোনো ভূমিকা থাকার প্রমাণ নেই।
পাহলভির নেতৃত্বের এই হোঁচট ইরান ঘিরে মার্কিন-ইসরায়েল কৌশলের প্রধান দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। আর তা হলো, বর্তমান ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসনের জায়গায় আসার মতো স্পষ্ট কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
ফেব্রুয়ারির শেষে বোমা হামলা শুরুর কিছুদিন পর ট্রাম্প ইরানের জনগণকে জেগে উঠে নিজেদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পরও সরকার এই আক্রমণ সামলে টিকে গেছে। বরং ইরানবিষয়ক অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ক্ষমতার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।
চলতি মাসে রয়টার্সকে দেওয়া দুটি সাক্ষাৎকারে পাহলভি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের বর্তমান সরকার পতনের ‘খুব কাছাকাছি’।
তিনি বলেন, ‘ইরানকে মুক্ত করার এই অভিযান ৪৬ বছর আগে আমার আজীবনের মিশন হিসেবে শুরু হয়েছিল। আর এটি কখনোই আমাকে নিয়ে ছিল না। এটি ছিল ইরানের জনগণ এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে।’
তার ভাষ্য, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পথে অন্তর্বর্তী সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া তার ভূমিকা।
তিনি বলেন, ‘আমি গন্তব্য নই, আমি গন্তব্যে পৌঁছানোর সেতু।’
এদিকে, পাহলভির সমর্থকেরা তাকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখলেও দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করার যেসব উদ্যোগে তিনি যুক্ত ছিলেন, তার কয়েকটি ভেঙে পড়েছে।
২০২৩ সালের এমন একটি ঘটনার বিষয়ে অবগত তিনজনের দাবি, পাহলভির স্ত্রী অন্য বিরোধী নেতাদের অপমান করেছিলেন। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুই অধিকারকর্মী আরও বলেন, ইরানে বিপুল সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রচারে পাহলভি কথাই বেশি বলেছেন, কাজ করেছেন কম।
এই প্রতিবেদনের জন্য রয়টার্স ৫০ জনের বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এর মধ্যে আছেন পাহলভির বর্তমান ও সাবেক আট সহযোগীও। শত শত পৃষ্ঠার আইনি নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং পাহলভি ও তার সমর্থকদের বিপুলসংখ্যক ভিডিও, ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রেকর্ড খতিয়ে দেখা হয়েছে। তার কিছু সমর্থক ইরানে বিপ্লব-পূর্ব রাজতন্ত্রও ফিরিয়ে আনার পক্ষে।
পাহলভির প্রধান পরিচয় হলো তিনি ইরানের শেষ শাহের ছেলে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক ইতিহাসের সফল বিপ্লবীদের অনেকের মতো—যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, পোল্যান্ডের লেখ ওয়ালেসা কিংবা তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ইসলামপন্থীরা—দেশের ভেতরে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত কোনো সংগঠিত গণআন্দোলন পাহলভির আছে বলে মনে হয় না।
অন্যদিকে ইরানের দমনমূলক সরকার এমন সম্ভাব্য বিরোধী নেতাদেরও নির্মূল করেছে, যারা পাহলভির মতো পরিচিত হয়ে উঠতে পারতেন। হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে কারাবন্দি বা হত্যা করা হয়েছে এবং বিদেশে সমালোচকদের হত্যার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
তবে নিজের প্রচেষ্টা হোঁচট খাচ্ছে, এমন ধারণা পাহলভি প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি একে এই সরকারকে উৎখাতের জন্য শক্তিশালী ‘সংগঠিত প্রচেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দেশে তার কোনো গণভিত্তিক আন্দোলন নেই, এ কথাও ‘সত্য নয়’ বলে রয়টার্সকে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, ৮ ও ৯ জানুয়ারি তার আহ্বানে বিপুলসংখ্যক ইরানি রাস্তায় নেমেছিলেন। সরকার গুলি চালালে তাদের অনেকেই নিহত হন।
তিনি বলেন, শ্রমিক, শিক্ষাঙ্গন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংগঠনজুড়ে ‘এক হাজারের বেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর’ ‘সেল নেতাদের’ সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে, যাতে ‘সুযোগ তৈরি হওয়ার মুহূর্তেই তারা হস্তক্ষেপ করতে প্রস্তুত থাকেন।’
ইরানের ভেতরে কতটি গোষ্ঠী তার সঙ্গে কাজ করছে, রয়টার্স স্বাধীনভাবে তা যাচাই করতে পারেনি।
পাহলভি বলেন, জানুয়ারিতে তেহরানের বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যাযজ্ঞ’ বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।
ওই মাসে ইরানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, সড়কের বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা অন্তত পাঁচ হাজারে পৌঁছেছে। পাহলভির দাবি, নিহতের সংখ্যা ৪০ হাজার।
তিনি বলেন, ‘এই শাসকগোষ্ঠী দেখিয়েছে, তাদের বিন্দুমাত্র দয়া নেই। তারা নিজেদের হাজার হাজার নাগরিককে হত্যা করতেও প্রস্তুত। তাই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখা হবে, তাতে পরিবর্তন আনতেই হবে।’
ইরানের জনগণই এখনো ‘মাঠের শক্তি’, তবে ‘খেলার মাঠ সমান করতে’ তাদের বিদেশি সামরিক সহায়তা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো সরকার বা নেতার সমর্থন চাই না। ইরানের বিকল্প কে বা কী হবে, তা কোনো বিদেশি সরকারের ঠিক করার বিষয় নয়। সেটি ইরানের জনগণের সিদ্ধান্ত।’
সাক্ষাৎকারে ইরানকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে ট্রাম্পের পোস্টের সরাসরি জবাব দেননি পাহলভি। তবে অতীতের মতো এবারও জোর দিয়ে বলেন, সামরিক হামলায় ‘শাসকগোষ্ঠীকে যতটা সম্ভব কঠিনভাবে আঘাত’ করতে হবে, কিন্তু ‘বেসামরিক অবকাঠামো’ রক্ষা করতে হবে।
নিজের আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উগ্র সমর্থকদের সহিংসতার দ্ব্যর্থহীন নিন্দা করেন পাহলভি। একইসঙ্গে দাবি করেন, ইরানের বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন এবং ‘জীবনের সব ক্ষেত্র ও সব মতাদর্শের’ প্রতিনিধিদের একত্র করেছেন।
তিনি বলেন, ‘এমনকি যারা একসময় আমার বাবার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিলেন, তাদের কাছেও আমি পৌঁছেছি। তারা পুরোপুরি আমার সঙ্গে কাজ করছেন।’
সমালোচকদের বিষয়ে পাহলভি বলেন, ‘তাদের মতামত দেওয়ার অধিকার আছে। কেউ হয়তো আমার চেহারা পছন্দ করেন না। কেউ হয়তো মনে করেন, আমার এটা-ওটা করা উচিত।’
তবে তার দাবি, ‘আমার মনে হয়, সামগ্রিকভাবে ইরানের ভেতরে ও বাইরে সব দিক থেকেই আমি ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি।’
এই সমর্থনের একটি অংশ যে তার পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে আসে, সেটিও স্বীকার করেন তিনি। ‘হ্যাঁ, কাকতালীয়ভাবে আমার নাম পাহলভি। আর সেটি ইতিবাচক ব্যাপার। রাস্তায় মানুষ তো এই নামেই স্লোগান দিচ্ছে’, বলেন তিনি।
স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে নির্ভুল জনমত জরিপ করা কঠিন। তবে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক গামান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক আম্মার মালেকির তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের শেষ দিকে ৩১ হাজার ৪৫০ ইরানির ওপর চালানো এক জরিপে প্রায় ৪৮ শতাংশ পাহলভিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। প্রতিষ্ঠানটি ইরানে অনলাইনে জনমত জরিপ চালায়।
শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বড় ছেলে রেজা পাহলভি ৪৮ বছর ধরে আছেন ইরানের বাইরে।
উড়োজাহাজের প্রতি আগ্রহী পাহলভি ১৯৭৮ সালে ১৭ বছর বয়সে জেট পাইলটের প্রশিক্ষণ নিতে টেক্সাসের রিস এয়ার ফোর্স বেসে যান। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি বিদেশেই থেকে যান। তার বাবার দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে সেই বিপ্লব শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।
পরে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সামাজিক বিজ্ঞান ও যোগাযোগে স্নাতক ডিগ্রি নেন পাহলভি।
নির্বাসিত জীবনে বারবার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। নন-হজকিন লিম্ফোমাজনিত জটিলতায় ১৯৮০ সালে তার বাবা মারা যান। ছোট বোন লেইলা ২০০১ সালে লন্ডনে অতিমাত্রায় মাদক সেবনে মারা যান। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ইরানবিষয়ক গবেষণায় ডক্টরাল শিক্ষার্থী তার ভাই আলিরেজা ২০১১ সালে আত্মহত্যা করেন।
দীর্ঘদিন ধরে তাকে চেনেন—এমন তিনজনের মতে, ৬৫ বছর বয়সী পাহলভি কখনো প্রচলিত অর্থে বেতনভুক্ত চাকরি করেননি। বরং নির্বাসনের বছরগুলো তিনি কাটিয়েছেন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে। নিজেকে তুলে ধরেছেন ইরানি বিরোধীদের নেতা হিসেবে, আর সময়ে সময়ে বিভিন্ন সমর্থক তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, যাদের কেউ কেউ পরে তার বিরুদ্ধেও গেছেন।
রয়টার্সকে পাহলভি বলেন, ‘কোনো আইনজীবী যদি বিনা পারিশ্রমিকে একটি মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন, তার মানে কি তার কোনো কাজ নেই? নিজের দেশের জন্য ত্যাগ হিসেবে চার দশক ধরে আমি স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে এই কাজ করে আসছি।’
উইসকনসিনের রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ডেরিক ভ্যান অর্ডেন মে মাসে ওয়াশিংটনে নিজের কার্যালয়ে পাহলভির সঙ্গে দেখা করেন।
তিনি বলেন, ‘পাহলভিকে তার সুবক্তা ও বিনয়ী মনে হয়েছে। তিনি লম্বা আর দেখতেও একেবারে প্রেসিডেন্টসুলভ।’
ভ্যান অর্ডেন জানান, শাহের গোপন পুলিশ সাভাকের ‘ঘৃণ্য’ কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি পাহলভিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনার বাবার শাসনের স্মৃতি সবার কাছে খুব ভালো নয়।’ পাহলভি সেটি স্বীকারও করেছিলেন।
সংঘাত প্রতিরোধবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ১৫ বছর আগে পাহলভির সঙ্গে দেখা করার পর তার মনে হয়েছিল, ইরানে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে যে কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মানসিকতা দরকার, পাহলভির মধ্যে তা নেই।
ভায়েজ বলেন, ‘তার সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারবেন, রাজনীতির চেয়ে ফুটবল, খাবার আর ফটোগ্রাফি নিয়ে তিনি অনেক বেশি আগ্রহী। তখনও একেবারেই স্পষ্ট ছিল, এখনো আছে—নেতা হওয়ার জন্য যা লাগে, তা তার নেই।’
পাহলভির বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করা অভ্যুত্থান নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘কিং অব কিংস: দ্য ইরানিয়ান রেভল্যুশন’ বইয়ের লেখক স্কট অ্যান্ডারসন বলেন, ‘তিনি একধরনের রাজতন্ত্রীদের বুদ্বুদের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে যারা তাকে চেনেন, তাদের কাছ থেকে আমি সব সময় শুনেছি, তিনি কিছুটা হালকা ধরনের ব্যক্তি।’
এর জবাবে পাহলভি বলেন, ‘কায়রোতে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর খুব সহজেই আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম, “জাহান্নামে যাক সব। অন্য অনেকের মতো আমিও নিজের জীবন, ব্যবসা বা অন্য কিছু নিয়ে থাকতে পারি।” কিন্তু আমি দেশের স্বার্থে এই লড়াইয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
তবে অ্যান্ডারসনসহ অন্য বিশেষজ্ঞরাও একমত, ইরানি বিরোধী নেতাদের মধ্যে পাহলভিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত।
নয় কোটির বেশি মানুষের দেশ ইরানের বিরোধী শিবিরে আছেন রাজতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী ও মার্ক্সবাদী, প্রজাতন্ত্রপন্থী এবং বিভিন্ন ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠী। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতায় তারা একমত হলেও এর বদলে কী ব্যবস্থা এবং কাকে ক্ষমতায় আনা উচিত, তা নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ আছে।
শাহের কর্তৃত্ববাদী উত্তরাধিকারের কথা উল্লেখ করে এসব বিরোধী গোষ্ঠীর কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, পাহলভি সত্যিই কি তার ঘোষিত পরিকল্পনা মেনে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে পরে ইরানিদের নিজেদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা বেছে নিতে দেবেন?
ইরানের জনগণ সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিলেও তিনি রাজা হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করবেন কি না, এ প্রশ্নে পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি তো বলছি, আমি কোনো পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না। এটি কখনোই আমার প্রধান চিন্তা ছিল না। আর শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থে কোনটি সবচেয়ে ভালো, তার ওপরও বিষয়টি নির্ভর করবে।’
তার বাবার শাসনামলে কিছু ইরানি যে স্থিতিশীলতা ও তুলনামূলক সমৃদ্ধি ভোগ করেছিলেন, সেই স্মৃতিকাতরতা সময়ের সঙ্গে পাহলভির ভাবমূর্তিকে করেছে উজ্জ্বল।
৫৪ বছর বয়সী নাহিদ খাজরাই ১৬ বছর বয়সে ইরান ছেড়েছিলেন। ১৬ মে নিউইয়র্ক সিটিতে পাহলভির সমর্থনে মিছিলে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের একজন ছিলেন তিনি।
তার গলায় ছিল ট্রাম্প ও পাহলভির ছবি-সংবলিত একটি লকেট। তিনি বলেন, এটি ‘মাগা’ বা ‘মেক ইরান গ্রেট অ্যাগেইনের’ প্রতীক।
পাহলভি সম্পর্কে তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাকে সবাই বিশ্বাস করবে। কারণ বিপ্লবের আগে আমাদের দাদা-দাদি, আমাদের পরিবারের সবাই ভালো দিন কাটিয়েছিলেন।’
দিলোভান এমাদালদিন সিলাশোর ভেবেছিলেন, তিনি মারা যাচ্ছেন।
৯ মার্চ ইরাকের এই কুর্দি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক লন্ডনের একটি কুর্দি রেস্তোরাঁয় সংঘর্ষের পরবর্তী পরিস্থিতি কাভার করতে গিয়েছিলেন। পাহলভির সমর্থকেরা সেখানে এসে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে বিপ্লব-পূর্ব ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা টাঙানোর দাবি জানালে এই সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। পতাকাটি শাহের ছেলের প্রতি সমর্থনের প্রতীক। ইরানের জনসংখ্যার আনুমানিক ১০ থেকে ১৭ শতাংশ কুর্দি।
সিলাশোর জানান, তিনি পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ইরানি ব্যক্তি রেস্তোরাঁর বাইরে পাহারায় থাকা স্থানীয় কুর্দিদের একটি দলকে গালিগালাজ করেন। এতে আরেক দফা সংঘর্ষ শুরু হয়।
সিলাশোর ভিডিও করার সময় কয়েকজন ইরানি তার ওপর চড়াও হন বলে তিনি জানান। তাকে মাটিতে ফেলে মাথা ও পিঠে বারবার লাথি ও ঘুষি মারা হয়। নিজেকে বাঁচাতে মাথার ওপর ব্যাগ ধরে রেখেছিলেন তিনি।
সিলাশোরের মনে হচ্ছিল, ‘এটাই আমার জীবনের শেষ।’
সেই রাতেই হাসপাতালে তার পাঁজরের ব্যাপক আঘাতের চিকিৎসা করা হয়। তিনি বলেন, এখনো পিঠ ও পায়ে ব্যথায় ভুগছেন।
হামলার বিষয়ে পুলিশকে জানানোর পর কর্মকর্তারা তাকে কয়েকটি ছবি দেখান। সেখান থেকে কথিত হামলাকারীদের একজনকে শনাক্ত করেন সিলাশোর।
রয়টার্স ওই ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করেছে। সেখানে পাহলভিপন্থী বিভিন্ন বিক্ষোভ ও সমাবেশে তার উপস্থিতির বহু পোস্ট আছে। অনেক পোস্টেই দেখা যায় ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা।
রয়টার্সকে অনলাইনে পাঠানো বার্তায় ওই ব্যক্তি সিলাশোরকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি ওই ছেলেটিকে মোটেও মারিনি।’
পুলিশ জানিয়েছে, দুজনকে গ্রেপ্তার করে কোনো অভিযোগ না দিয়েই ছেড়ে দেওয়ার পরও তদন্ত চলছে।
যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রিয়া—এই তিন দেশে সাম্প্রতিক অন্তত চারটি ঘটনায় পাহলভির সমর্থকদের সহিংসতা বা হয়রানিতে জড়িত থাকার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে রয়টার্স।
এছাড়া মার্চে কানাডায় পাহলভির এক সমালোচককে হত্যার অভিযোগে তার দুই সমর্থকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
সমর্থকদের সহিংসতা নিয়ে পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি এর নিন্দা করি। আমি নিজেকে এসব থেকে দূরে রাখি। আমি এর পক্ষে কোনো যুক্তি দিই না। আমি এটি সমর্থনও করি না। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার দাবি, তারা যে অপরাধ করেছে, তার জন্য যেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আপনি ইচ্ছামতো গিয়ে মানুষকে নির্মমভাবে মারধর শুরু করতে পারেন না।’
পুলিশের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, নেদারল্যান্ডসে ইরানিদের অনলাইনে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে চালানো প্রচারণা তদন্ত করছে দ্য হেগের পুলিশ।
৪৬ বছর বয়সী ব্যবসায়িক পরামর্শক শাবনাম হোসেইনি ২২ জুন ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে জানান, নেদারল্যান্ডসে ইরানিদের ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে প্রকাশের অভিযোগে ডাচ কর্তৃপক্ষ তাকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
পোস্টটির শেষে তিনি ‘জাভিদ শাহ’ স্লোগান দেন। ফারসি এই কথার অর্থ ‘রাজা দীর্ঘজীবী হোন’। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টেও পাহলভির সমর্থনে বিপুল কনটেন্ট আছে।
হোসেইনির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তুদের একজন ছিলেন ৩৮ বছর বয়সী এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী।
১৬ জানুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আসন্ন হামলার বিরুদ্ধে দ্য হেগের কাছে এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রকৌশলী রয়টার্সকে বলেন, কয়েক ঘণ্টা পর তিনি দেখতে পান, অনলাইনে তার ছবি ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন পোস্টে তাকে ইরান সরকারের অনুগত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এমন একটি পোস্ট করেছিলেন হোসেইনি। সেখানে প্রকৌশলীর ছবি প্রকাশ করেন তিনি।
পোস্টে হোসেইনি আরও বলেন, তিনি ডাচ গোয়েন্দা সংস্থা এআইভিডি, সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা এনসিটিভি এবং ওই ব্যক্তির নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে ওই প্রকৌশলীর নির্দিষ্ট কিছু করপোরেট ডেটায় প্রবেশাধিকার বাতিল করার আহ্বান জানান, যাতে তিনি বিদেশে ইরানিদের লক্ষ্যবস্তু করতে তেহরানকে সহায়তার জন্য সেসব তথ্য ব্যবহার করতে না পারেন।
পুলিশের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের অভিযোগের ঢল সামলাতে হয় ওই প্রকৌশলীকে। এতে তিনি তীব্র উদ্বেগে ভুগতে থাকেন।
প্রকৌশলীর প্রতিষ্ঠান রয়টার্সকে জানায়, তারা ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত’। তবে আর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এআইভিডি, এনসিটিভি ও ডাচ জাতীয় পুলিশ—কেউই হোসেইনির সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, তা জানাতে রাজি হয়নি। আর তার বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি দ্য হেগের পুলিশ।
হোসেইনি রয়টার্সকে বলেন, প্রকৌশলীকে নিয়ে করা পোস্টের বিষয়ে পুলিশ তাকে কোনো প্রশ্ন করেনি এবং ওই পোস্ট করার জন্য তার কোনো অনুশোচনা নেই।
তার দাবি, ওই প্রকৌশলী যে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, সেটি ছিল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থকদের সমাবেশ। বর্তমান সরকারের পতনের পর যে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আদালত’ প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে তিনি মনে করেন, তার জন্য সন্দেহভাজন সমর্থকদের তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় একটি পারস্য রেস্তোরাঁর মালিক মেহদি শাহপারভেরির মুখোমুখি হন নিজেদের পাহলভি সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন। তারা তাকে বিপ্লব-পূর্ব পতাকা টাঙানোর দাবি জানান।
শাহপারভেরি রয়টার্সকে বলেন, তিনি রাজি না হওয়ায় তারা ব্যবসা ধ্বংস করার হুমকি দেন, কর্মীদের অপমান করেন এবং ক্রেতাদের ভয় দেখান। ঘটনাটি ভিডিও করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আছে।
চলতি মাসে এক বিচারে একজনকে দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়—বিপজ্জনক হুমকি দেওয়া এবং জবরদস্তি করা। তাকে শাহপারভেরিকে প্রতীকী ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০০ ইউরো দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভিয়েনার কৌঁসুলিরা জানান, এক নারী সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত চলছে।
ভিয়েনার ওই রেস্তোরাঁর ঘটনার কিছুদিন পর লন্ডনের একটি হোটেলে শিক্ষাবিদ ও বিরোধী নেতারা একটি সম্মেলন করেন। তাদের মধ্যে এমন কয়েকজনও ছিলেন, যারা বিরোধী শিবিরের আরও বিস্তৃত অংশকে কাছে না টানার জন্য পাহলভির সমালোচনা করেছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানানো দুজন অংশগ্রহণকারী বলেন, বাইরে পাহলভির সমর্থকদের ভিড় থেকে সহিংসতার আশঙ্কায় আয়োজকেরা কয়েকজনকে বেসমেন্টের বের হওয়ার পথ দিয়ে গাড়িতে করে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তাদের একজন রয়টার্সকে বলেন, তারপরও তিনি হেঁটে বের হন। প্রায় ২০ জনের একটি দল তাকে ঘিরে ধরে গায়ে থুতু দেয়, মাটিতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং ‘জাভিদ শাহ’ বলতে চাপ দেয়। তিনি অস্বীকার করলে আবারও গায়ে থুতু দেওয়া হয়।
রয়টার্স স্বাধীনভাবে তার এই বর্ণনা যাচাই করতে পারেনি।
পাহলভির কিছু সমালোচকের মতে, তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী এবং স্ত্রী অন্য ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে যে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। এতে আগে থেকেই বিভক্ত বিরোধী শিবিরে বিভাজন আরও বেড়েছে।
২০২৩ সালের শুরুতে বিরোধী নেতারা ঐক্যের একটি উদ্যোগ শুরু করেন। ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বৈঠক হওয়ায় এটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘জর্জটাউন কোয়ালিশন’ নামে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের মার্চে টরন্টোতে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নিতে সদস্যরা জড়ো হন।
মঞ্চে ওঠার আগে পাশের একটি কক্ষে অপেক্ষা করার সময় নির্বাসিত যুবরাজের ৪০ বছরের স্ত্রী ইয়াসমিন পাহলভি সেখানে ঢোকেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনজনের দাবি, কোনো উসকানি ছাড়াই তিনি অন্য ভিন্নমতাবলম্বীদের বলেন, তার স্বামীর তুলনায় তারা ‘কেউ না’।
কথাটি উপস্থিত ব্যক্তিদের হতবাক করে।
তাদের মধ্যে ছিলেন হামেদ এসমাইলিয়ন। ২০২০ সালে আইআরজিসি ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ভূপাতিত করলে তার স্ত্রী ও মেয়ে নিহত হন।
সেখানে আরও ছিলেন ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী মাসিহ আলিনেজাদ, যাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটের গতিপথ নিয়ে মতবিরোধের মধ্যে এটি ভেঙে যায়।
রয়টার্সকে দেওয়া বিবৃতিতে ইয়াসমিন দাবি করেন, তিনি কখনো এমন কথা বলেননি। অভিযোগটিকে তিনি ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘টরন্টোতে এমন কোনো কথোপকথন ঘটেনি। এ ধরনের মিথ্যা হতাশাজনক।’
যুবরাজের ঘনিষ্ঠ মহলের অন্যদের বিরুদ্ধেও পাহলভির বিরোধীদের ওপর বিভাজন সৃষ্টিকারী আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে।
তার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীদের একজন সাঈদ ঘাসেমিনেজাদ জানুয়ারিতে এক্সে লেখেন, ‘হয় আপনি প্রিন্স রেজা পাহলভির সঙ্গে, নয়তো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে। যেকোনো কারণেই যদি আপনি মাঠের কমান্ডারকে দুর্বল করেন, তাহলে আপনি শত্রুর এজেন্ট।’
ঘাসেমিনেজাদ রয়টার্সকে বলেন, পোস্টটি রাজতন্ত্রী আন্দোলনের ‘একটি ছোট উগ্র অংশকে’ উদ্দেশ করে লেখা হয়েছিল।
তার দাবি, ইরানের ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নির্ধারণে গণভোটের ওপর জোর দেওয়ায় ওই অংশ পাহলভিকে আক্রমণ করছিল।
ইরানভিত্তিক ভিন্নমতাবলম্বী হোসেইন রোনাঘি দেশটির কর্তৃপক্ষের হাতে একাধিকবার কারাবন্দি হয়েছেন। তিনি রয়টার্সকে বলেন, পাহলভির সমর্থকেরা বারবার তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন।
এসব হামলার জন্য পাহলভিকে দায়ী করেন না তিনি। ‘তবে হুমকি, ভয়ভীতি, বানোয়াট অভিযোগ এবং বিরোধীদের বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে, বারবার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে কথা বলার রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব তার আছে’, বলেন তিনি।
পাহলভি বলেন, তাদের কিছু বক্তব্য নিয়ে তিনি ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের জন্য ‘অনেক কঠোর একটি প্রটোকল’ তৈরি করছেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা আর স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না। আপনাদের আরও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।’
৬ মার্চ কানাডার ভ্যাংকুভারের কাছে বসবাসকারী ইরানি বংশোদ্ভূত শিক্ষাবিদ ও গণিতের শিক্ষক মাসুদ মাসজুদির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর কিছুদিন পর তাকে হত্যার অভিযোগে পাহলভির দুই সমর্থকের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ মামলা করে।
মাসজুদি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী একজন নিবেদিত ইরানি কর্মী। আগে পাহলভিকেও সমর্থন করেছিলেন তিনি। এমনকি ২০২১ সালে পাহলভির সঙ্গে দীর্ঘ ভিডিও আলাপেও অংশ নিয়েছিলেন।
পাহলভির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী ঘাসেমিনেজাদ ও আমির এতেমাদির সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল। তাদের পরিচিত এক ব্যক্তি জানান, তিনজনই কাছাকাছি সময়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।
পরে তিনজনই পাহলভিপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন ইরানিয়ান লিবারেল স্টুডেন্টস অ্যান্ড গ্র্যাজুয়েটসের সক্রিয় সদস্য হন।
মাসজুদি ও এতেমাদি ইরান রিভাইভাল নেটওয়ার্ক বা ফারাশগার্দেও যোগ দেন। এই সংগঠনটিও যুবরাজকে সমর্থন করত।
ঘাসেমিনেজাদ নিশ্চিত করেছেন, তিনি মাসজুদির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তবে কয়েক বছর ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না বলে জানান। এতেমাদি মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাহলভির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন মাসজুদি।
২০২৪ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সুপ্রিম কোর্টে পাহলভি ও তার কয়েকজন সমর্থকের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত এসব মামলার নথি পৌঁছায় কয়েক হাজার পৃষ্ঠায়।
একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়, ‘নিজের দপ্তর, উপদেষ্টা, সচিব ও সহযোগীদের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী ইরানি কর্মীদের, বিশেষ করে গণতন্ত্রপন্থীদের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা পরিচালনার দীর্ঘ ইতিহাস আছে পাহলভির।’
মাসজুদির যুক্তি ছিল, পাহলভি ‘তার সমর্থকদের কর্মকাণ্ডের জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী’, কারণ তারা ‘তার প্রভাবে কাজ করছিলেন’।
শুরুতে নিজের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলায় সাড়া দেননি পাহলভি।
কিন্তু মাসজুদি তার বিরুদ্ধে একতরফা রায় পেয়েছেন জানতে পেরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুটি শপথনামা দাখিল করেন পাহলভি। সেখানে মাসজুদির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
দুটি শপথনামাতেই তিনি বলেন, ‘বাদী মাসুদ মাসজুদিকে আমি চিনি না।’
তবে অনলাইনে দুই ব্যক্তির দেখা হয়েছিল।
২০২১ সালের জুলাইয়ে পাহলভি ও অন্য দুই অধিকারকর্মীর সঙ্গে জুমে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও কলে অংশ নিয়েছিলেন মাসজুদি। কলটি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি এই তথ্য জানান।
মাসজুদি সেটি রেকর্ড করেছিলেন এবং পরে কলের যে অংশে তার ও পাহলভির কথোপকথন আছে, সেটি ইউটিউবে প্রকাশ করেন।
এছাড়া ফারাশগার্দে সক্রিয় সাঈদ হোসেইনপুর বলেন, সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে পাহলভির বহু জুম কলের কয়েকটিতে মাসজুদিও ছিলেন।
পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, জুমে তিনি হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। ‘এই ব্যক্তির সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট কথোপকথন হয়েছে বলে সত্যিই আমার মনে পড়ে না।’
গত বছরের শেষ দিকে মাসজুদি নিশ্চিত হয়ে যান, ‘রেজা পাহলভির অন্ধ দুই সমর্থক’ তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। ওই দুজনের বিরুদ্ধেও মামলা করেছিলেন তিনি।
অক্টোবরে এক্সে তিনি দাবি করেন, কথিত ষড়যন্ত্রকারী মেহদি আহমাদজাদেহ রাজাভি ও আরেজু সোলতানি তাকে হত্যার জন্য প্রাণঘাতী কোনো পদার্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন, যাতে পাহলভি ও অন্যদের বিরুদ্ধে তার করা মামলাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় চিকিৎসক রোসিতা ফাতেমি পরে একটি শপথনামা জমা দেন। সেখানে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কথিত দুই ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল এবং তাদের একজন মাসজুদিকে হত্যা করার জন্য তার কাছে একটি ওষুধজাত পদার্থ চেয়েছিলেন।
তিনি ওই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে জানান। মন্তব্যের অনুরোধে ফাতেমি সাড়া দেননি।
রয়টার্সকে মাসজুদির কয়েকজন বন্ধু জানান, তিনি কিছু বার্তা পাঠিয়ে রেখেছিলেন। নির্দেশনা ছিল—যদি কখনো তাকে হত্যা করা হয়, তবে সেই বার্তাগুলো যেন পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
একটি বার্তায় পাহলভির সঙ্গে তার জুম কলের কথাও উল্লেখ ছিল।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রতিবেশীরা মাসজুদিকে নিখোঁজ বলে জানান।
পরের মাসে তার মরদেহ পাওয়ার পর যে দুজনের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছিলেন মাসজুদি, তাদের বিরুদ্ধেই প্রথম ডিগ্রির হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
দুই সন্দেহভাজনের আইনজীবীরা মামলাটি নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। অভিযুক্ত দুজনই হেফাজতে আছেন।
পাহলভি কোনোভাবে এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি মর্মান্তিক। এই হত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের আদালতের মুখোমুখি হওয়া এবং তাদের অপরাধের বিচার হওয়া উচিত।’
মাসজুদির করা মামলাগুলো কার্যত থেমে গেছে। ভ্যাংকুভারের একজন বিচারক রায় দিয়েছেন, তার মৃত্যুর কারণে মামলাগুলো খারিজের জন্য আসামিপক্ষের আবেদনগুলো এখন ‘অর্থহীন’ হয়ে গেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দেশে দমন-পীড়ন এবং বিদেশে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার আইআরজিসি।
গোষ্ঠীটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার পক্ষে পাহলভি বারবার টুইট করেছেন। এমন ঘোষণা হলে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাদের ব্যাংকিং ও ব্যবসা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, ‘অন্তত গত ১০ বছর ধরে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার প্রথম দিককার সমর্থকদের একজন আমি।’
কিন্তু রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করতে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ সৃষ্টির বৈশ্বিক প্রচারে যুক্ত দুই অধিকারকর্মীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং অন্তত একটি সংবাদপত্রে মতামত নিবন্ধ ছাড়া পাহলভির উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত।
সুইডেনের ইরানি বংশোদ্ভূত পার্লামেন্ট সদস্য আলিরেজা আখোন্দি ছিলেন ওই প্রচারের একজন নেতা।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে দুবার পাহলভির সঙ্গে দেখা করে তার সমর্থন চেয়েছিলেন। তখন ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর্গ এবং পরে ব্রাসেলসে বিক্ষোভের আয়োজন করছিল প্রচারাভিযানটি।
আখোন্দি বলেন, তিনি পাহলভিকে এমন একটি বিবৃতিতে সই করতে বলেছিলেন, যা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর বিস্তৃত সমর্থন দেখানো।
এছাড়া তাকে ব্রাসেলসের সমাবেশে যোগ দিতে অথবা অন্তত নিজের মেয়েকে পাঠাতে বলেছিলেন তিনি।
আখোন্দি জানান, তিনি পাহলভিকে বলেছিলেন, ‘আপনি চাইলে এই প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পারেন।’
একটি বৈঠকের পর পাহলভি উত্তর দেবেন বলেছিলেন বলে স্মরণ করেন আখোন্দি। ‘তিনি দেননি।’
আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী তালিকায় রাখার পক্ষে পাহলভি টুইট করলেও ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেননি এবং দুটি সমাবেশের কোনোটিতেই যাননি বলে জানান আখোন্দি।
ভিন্ন ভূমিকায় ওই প্রচারে কাজ করা হাসান ভেরকিয়ানি বলেন, ‘রেজা পাহলভি আমাদের বয়কট করেছিলেন’ এবং ‘আইআরজিসি-বিষয়ক প্রচারের সঙ্গে যুক্ত সব অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ এড়িয়ে গেছেন।’
এর জবাবে পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, কখনো কখনো অধিকারকর্মীরা ‘সামগ্রিক কোনো উদ্দেশ্যের বদলে নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচার জোরদার করতে আপনাকে ব্যবহার করতে চান।’
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সম্ভবত সমস্যাটি সেখানেই।’
ভেরকিয়ানির মতে, পাহলভির সঙ্গে আখোন্দির দ্বিতীয় বৈঠকের কয়েক দিনের মধ্যেই যুবরাজের অনেক সমর্থক জানান, তারা আর এই প্রচারে কাজ করবেন না। আর্থিক সহায়তাও বন্ধ হয়ে যায়।
ভেরকিয়ানি স্মরণ করেন, ‘যারা গতকাল পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসেছিলেন’, তারাই এখন ‘আমাদের সঙ্গে লড়াই করছিলেন’ এবং বলছিলেন, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই।
আখোন্দি বলেন, অনলাইনে ‘সমন্বিত অপপ্রচার’ চালিয়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়।
তিনি প্রাণনাশের হুমকিও পান। এর পরিপ্রেক্ষিতে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ তাকে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তা দেয়, যা তিন বছরের বেশি সময় পরও বহাল আছে বলে তিনি জানান।
সুইডিশ নিরাপত্তা সংস্থা কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা আছে কি না, তা নিশ্চিত বা অস্বীকার করতে রাজি হয়নি। তাদের ভাষ্য, এমন তথ্য প্রকাশ করলে ‘দুর্বলতা তৈরি হতে পারে এবং আমাদের পদ্ধতি প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।’
আখোন্দি তাঁর প্রচার চালিয়ে যান।
জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালেই তা করেছিল।
এরপর পাহলভি টুইট করেন, ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার ইইউর সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই।’
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা চালানোর পর ১৫ জন শীর্ষ ইরানি-আমেরিকান ব্যবসায়ী পরিস্থিতি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করতে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলেন।
শেষ পর্যন্ত সদস্যসংখ্যা বেড়ে পৌঁছায় ২৮ জনে।
এক সদস্যের ভাষ্য, তাদের নেতৃত্বাধীন কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বর্তমান বাজারমূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।
জানুয়ারিতে ইরানের হাজার হাজার বিক্ষোভকারী পাহলভির নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছেন বলে খবর আসার পর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্যরা তাকে আর্থিকভাবে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করেন। সবাই অবশ্য উৎসাহী ছিলেন না।
গ্রুপটির একজন সদস্য বলেন, ‘এই লোকটিই যে সঠিক ব্যক্তি, সে বিষয়ে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল না।’
শেষ পর্যন্ত ১০ জনেরও কম সদস্য মিলে মোট ৩০ লাখ ডলারের বেশি দিয়েছিলেন বলে ওই ব্যক্তি জানান।
দাতাদের মধ্যে ছিলেন উবারের প্রধান নির্বাহী দারা খসরোশাহী। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের ঠিক আগে তার পরিবার ইরান ছেড়ে যায়।
উবারের একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, খসরোশাহী অর্থ দিয়েছিলেন। তবে তিনি রাজতন্ত্রী নন এবং মূলত পাহলভির নিরাপত্তার খরচে সহায়তার জন্য অর্থ দিয়েছিলেন।
মুখপাত্র বলেন, পাহলভি কেবল ইরানে গণতন্ত্র চালুর পথে অন্তর্বর্তী একজন ব্যক্তি হিসেবে কাজ করতে চান, এমনটা বুঝেই খসরোশাহী অর্থ দিতে রাজি হন।
পাহলভির পরিচিতি বাড়াতে আরেক দাতা জেপিমরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমনের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ব্যবস্থা করেন।
ব্যাংকটির একজন মুখপাত্র বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন, তবে আলোচনার বিষয়বস্তু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
তৃতীয় এক দাতা, রিয়েল এস্টেট লজিস্টিকস জায়ান্ট প্রোলজিসের নির্বাহী চেয়ারম্যান হামিদ মোগাদাম ফেব্রুয়ারির শুরুতে ওয়াশিংটনে যান। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডাগ বার্গামের সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
মোগাদাম রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম এমন একজন ইরানি-আমেরিকানের মতামত শুনুন, যিনি ইরানের জনগণের গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন।’
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যেন পাহলভির সঙ্গে যোগাযোগ করে—এই আশায় গণতন্ত্রের সম্ভাব্য পথ হিসেবে তার নাম উল্লেখ করেছিলেন।
রুবিও তার কথা শুনলেও কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি বলে জানান মোগাদাম।
পাহলভি রয়টার্সকে বলেন, সম্প্রতি তিনি বড় অঙ্কের অনুদান সংগ্রহ শুরু করেছেন।
অতীতে তার অর্থায়নের বেশির ভাগই ছোট ছোট অনুদান থেকে এসেছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘বাইরের কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এক পয়সাও আসেনি।’
তার অর্থায়নের সব উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
পাহলভির চিফ অব স্টাফ ক্যামেরন খানসারিনিয়া বলেন, অর্থের বেশির ভাগই নিরাপত্তা, ভ্রমণ, কর্মীদের বেতন, গণমাধ্যম প্রকল্প এবং নতুন সরকারে রূপান্তরের পরিকল্পনায় ব্যয় হয়।
এক ইরানি-আমেরিকান দাতা বলেন, ধারণা ছিল পাহলভি তার আর্থিক সমর্থকদের পরামর্শে আরও মনোযোগ দেবেন।
কিন্তু পাহলভি ও কয়েকজন ব্যবসায়ীর মধ্যে নিয়মিত ভিডিও কল হওয়ার পরও ‘বাস্তবে তা হয়নি।’
ওই দাতা আর কোনো অর্থ দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ব্যবসায়ী। বিনিয়োগ করলে তার ফল পেতে চান।’
এর জবাবে পাহলভি বলেন, ‘কোনো দাতা অর্থ দিয়েছেন বলে তার প্রত্যাশা অনুযায়ী আমি আমার মিশন বদলাব না। আপনাকে টাকা দিলাম, তাই আপনাকে এক্স, ওয়াই ও জেড করতে হবে, এভাবে বিষয়টি চলে না।’
এখন যুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠায় হতাশ দাতাদের সামলানোর চেয়েও বড় নেতৃত্বের পরীক্ষার মুখে পড়েছেন পাহলভি।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধবিরতি যে ‘টিকবে না’, তা তিনি জানতেন।
চুক্তি হওয়ার পর তিনি ‘একটি অপরাধী শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তি ও আপসের’ নিন্দা করেছিলেন।
গত সপ্তাহে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ইরানের জনগণকে ‘যেকোনো ধরনের আলোচনায়’ ‘ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
‘হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা কিংবা পারমাণবিক চুক্তি অর্জনের জন্য মানুষ প্রাণ দেয়নি। তারা স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য প্রাণ দিয়েছে’, বলেন তিনি।
কয়েক দশক ধরে পাহলভি বলে আসছেন, গণতন্ত্র অর্জন করতে হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটতেই হবে।
কিন্তু নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে অন্তত চার মার্কিন সেনা নিহত এবং আরও অনেকে আহত হওয়ার পরও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
আর পাহলভির সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, ওয়াশিংটন সেটিই দাবি করছে না—শাসন পরিবর্তন।

