যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে একই দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে ওয়াশিংটনে অবস্থানকালে দুই নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউস বৈঠক দুটিকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছে। তবে পর্দার আড়ালের আলোচনা, বিশেষ করে ইরান, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উঠে এসেছে।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে প্রথমে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। এরপর সকাল ১১টা ৩ মিনিটে ওভাল অফিসে শুরু হয় ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠক, যা শেষ হয় দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে। দুটি বৈঠকই সংবাদমাধ্যমের জন্য বন্ধ ছিল।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকে গুরুত্ব পেল ইরান
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জেলেনস্কি ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষ করেছেন এবং দুটি বৈঠকই ছিল ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’।
বৈঠক শেষে ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য, বৈঠকটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং দুই নেতার মধ্যে ‘চমৎকার রসায়ন’ স্পষ্ট ছিল।
ইসরায়েলি কর্মকর্তার দাবি, আলোচনায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আবারও একমত হন যেকোনো পরিস্থিতিতেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের আগে ট্রাম্পের বিরক্তির ইঙ্গিত
নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে কিছুটা বিরক্তির সুরে কথা বলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ইরানের ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’ নামের একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে বিবির (নেতানিয়াহু) কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক কী ঘটছে তা জানি।’
ট্রাম্প আরও বলেন, নেতানিয়াহু বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন, কারণ তিনি চান যুক্তরাষ্ট্র ইরান ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকুক।
তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প পরে বলেন, ইরান নিয়ে তাদের মধ্যে ‘সামান্য কিছু মতপার্থক্য’ রয়েছে, তবে দুই দেশের অবস্থান মূলত কাছাকাছিই।
টানাপোড়েন কমানোর চেষ্টা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পের সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর অষ্টম বৈঠক।
যদিও দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুন মাসে দুই নেতার মধ্যে এক উত্তপ্ত ফোনালাপের খবর প্রকাশ্যে আসে, যেখানে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। পরে ট্রাম্প নিজেও সেই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানেও কিছু পার্থক্য সামনে এসেছে। ট্রাম্প যেখানে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলেছেন, সেখানে নেতানিয়াহু সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে ওয়াশিংটনের বৈঠকে উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে মতৈক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
জেলেনস্কির সঙ্গে যে আলোচনা
নেতানিয়াহুর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প।
বৈঠক শেষে জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ইন্টারসেপ্টর উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে ট্রাম্পের বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
যদিও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ফলে দেশটির নিজস্ব মজুত পুনর্গঠন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমছে
এদিকে বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর বিস্তৃত রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকলেও বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে তার অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নেই।
বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাম্প্রতিক এক ভোটে শতাধিক ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তা কমানোর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও বিভক্তি দেখা যাচ্ছে। দলটির একটি অংশ এখনো ইসরায়েলের প্রতি শক্ত অবস্থান বজায় রাখার পক্ষে থাকলেও ট্রাম্পের ‘মাগা’ ঘরানার অনেক নেতা ও সমর্থক মনে করছেন, ইরান ইস্যুতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে।
পিউ রিসার্চের এক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
হোয়াইট হাউসের বাইরে বিক্ষোভ
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সফরকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউসের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে মিছিল করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।
তবে আগের সফরগুলোর তুলনায় এবারের বিক্ষোভ ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট ও শান্তিপূর্ণ।

