হাতে একটি ছবি। চোখের কোণে জল। একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রতিদিন সকালে কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ান সতী সিগদেল।
অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন দেয়ালে টাঙানো প্রতিটি ছবি। অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও আশার আলো খুঁজছেন তিনি।
বলেন, ‘তিন দিন আগে ওর ছবিটা এই দেয়ালে টাঙিয়েছিলাম। প্রতিদিন আসি, যদি একবার অন্তত কোনো ভালো খবর পাই।’
২০ বছর বয়সী বোন সুইটি পাইথানকে খুঁজছেন সতী।
গত ২৬ আগস্ট হিমবাহধসে সৃষ্টি হওয়া ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত নেপালে নিখোঁজ চার হাজার ২০০ মানুষের তালিকায় রয়েছেন সুইটি পাইথানও।
আজও তার কোনো খোঁজ পাননি বোন সতী।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে এই দেয়ালের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিখোঁজদের দেয়াল’।
শত শত ছবি দেয়ালজুড়ে। কোনোটিতে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন এক তরুণী, আবার কোনোটিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন এক দম্পতি—ছবির ওপর হাতে লেখা ‘নিখোঁজ’।
কিছু ছবি দেখতে পোস্টারের মতো। ছবির পাশে লেখা রয়েছে নাম-পরিচয়, বাড়ির ঠিকানা ও যোগাযোগের নম্বর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এই ছবিটি শুধু একটি দেয়ালে নয়, নেপালের আরও অনেক গ্রাম কিংবা শহরের দেয়ালে টাঙানো হয়েছে।
আরেকটি ছবিতে এক পেশীবহুল যুবক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তার বাঁ হাতে আঁকা ট্যাটুর ক্লোজ-আপ ছবিও যুক্ত রয়েছে এক পাশে, যাতে ট্যাটু দেখে অন্তত শনাক্ত করা যায় ছেলেটিকে!
এসব অসংখ্য হাসিমুখের ছবির মাঝে কিছু বীভৎস নিথর ছবিও রয়েছে, যার পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা। এসব মানুষের মরদেহ পাওয়া গেলেও নাম-পরিচয় এখনো জানা যায়নি।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এই দেয়ালটিই এখন স্বজনহারা পরিবারগুলোর শেষ ভরসা।
অনেক পথ পাড়ি দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এসেছেন স্বপ্না নেওপানে।
ছবির দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলেন অনেকক্ষণ। শত শত ছবির মাঝে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তার পরিবারের চার সদস্যের কাউকেই পেলেন না স্বপ্না।
ব্যাকুল হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে চারটি নাম বলে জানতে চাইলেন, ‘এই নামগুলো কখনো শুনেছেন কি না?’
উত্তর পাননি স্বপ্না।
বলেন, ‘আমরা এখন অপেক্ষায় আছি, যদি অলৌকিক কিছু একটা ঘটে।’
দেয়ালের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘এই শত শত ছবির দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এই দেয়ালের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যে কতটা যন্ত্রণার, তা বলে বোঝানো যাবে না।’
ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এক সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কাউকে জীবিত উদ্ধারের আশা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে।
তবুও নেপালের উদ্ধারকর্মীরা অদম্য সাহসে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। আর স্বজনদের অনেকে প্রিয় মানুষটিকে জীবিত হোক বা মৃত,একবার দেখার আশায় অপেক্ষা করছেন। যদি মারা যায়, তবে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মেনে তাকে বিদায় জানাতে চান তারা।
অনেকে আবার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
ত্রিভুবন টিচিং হাসপাতাল থেকে কিছুটা দূরে, বাগমতি নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দিরের সামনে দেখা গেছে তেমনই কিছু দৃশ্য।
২১ বছর বয়সী সবিনের শেষকৃত্য করছেন তার পরিবার। চিতা সাজানো হলেও সেখানে সবিনের মরদেহ নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে খড়ের তৈরি পুত্তলিকা। তাতেই আগুন দেন স্বজনরা।
সবিনের আপনজন তাপিন্দ্র প্রসাদ তিমালসিনা চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসছে। দেহটা পর্যন্ত পেলাম না, শেষ বিদায়টা দিতে হচ্ছে এই খড়ের পুতুল পুড়িয়ে…’
পশুপতিনাথের ঘাটে যখন পোড়া খড়ের ছাই বাতাসে উড়ছে, তখন হাসপাতালে ‘নিখোঁজদের দেয়ালের’ সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সতী সিগদেলের মতো অনেক নেপালি। এখনই হাল ছাড়তে রাজি নন তারা। তাদের চোখে অলৌকিক কিছু ঘটার প্রতীক্ষা।

