গণশুনানি কাল, আরও বাড়তে পারে এলপিজির দাম

রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি গ্রাহকদের আরেকটি ধাক্কার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে, যা মূলত এলপিজির পুনর্নির্ধারিত মূল্য থেকে আদায় করা হবে।

২০২১ সালের এপ্রিলে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় প্রক্রিয়া চালুর পর এবারই প্রথম গণশুনানি করতে যাচ্ছে কমিশন।

চলতি মাসের শুরুতে ব্যবসায়ীরা তাদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন জানানোর পর এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যদিও এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্রাহকরা বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে এলপিজি কিনছেন বাজার থেকে।

বিইআরসি সেপ্টেম্বরে প্রতি ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়ার পর সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে গ্রাহকদের অনেকক্ষেত্রে কিনতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে।

৪ অক্টোবর এক লাফে ২৫২ টাকা দাম বাড়িয়ে প্রতি বোতলের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এখনো খুচরা বাজারে এর দাম ২ হাজার ২০০ টাকার ওপরেই আছে। দেশের এক কোটির বেশি এলপিজি গ্রাহককে একটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত গুণতে হচ্ছে।

চলতি সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে অন্তত ১০ জন গ্রাহক, ৬ জন খুচরা বিক্রেতা, ২ জন পরিবেশক এবং ২ জন আমদানিকারকের সঙ্গে কথা বলে বাজারের এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বিইআরসি ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, আমদানিকারক ও বোতলজাত কোম্পানিগুলো পরিবেশকদের কাছে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪২ টাকায় বিক্রি করবে। বিতরণ খরচ সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা যোগ করে পরিবেশকেরা সেটি খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ১ হাজার ৭৯২ টাকায় বিক্রি করবে।

সবশেষে খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা ধরে সিলিন্ডারটির গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ মূল্য দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।

কিন্তু বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পরিবেশকরাই কোম্পানিভেদে একটি সিলিন্ডার কিনছেন ১ হাজার ৮৫০ টাকার বেশি দামে। নিজেদের ৫০ টাকার কমিশনের বিপরীতে ২০০-৩০০ টাকা রেখে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন অন্তত ২ হাজার ১০০ টাকায়।

পরে খুচরা বিক্রেতারাও তাদের কমিশনের চেয়ে বেশি মুনাফা ধরে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। আর এই বাড়তি মুনাফার যৌক্তিকতা হিসেবে বলছেন অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জ্বালানি খরচ, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি।

গত ১৩ অক্টোবর ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের ৪ পরিবেশক বিইআরসিতে তাদের এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেন।

সবগুলো আবেদনের ভাষা একই। এতে পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আবেদনপত্রগুলোতে বলা হয়েছে, আমদানিকারক ও বোতজাতকরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসি নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে মাসে একাধিকবার দাম সমন্বয় করে। ফলে বাধ্য হয়ে তাদেরও বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রি করতে হচ্ছে।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একজন এলপিজি পরিবেশক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিইআরসি নির্ধারিত বিতরণ খরচ যথেষ্ট নয়।

বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো পরিবেশকদের গুদামে ১ হাজার ৭৪২ টাকা দরে প্রতিটি সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা না দেওয়ায় পরিবেশকদের নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে সেটি সংগ্রহ করতে হয়।

তিনি বলেন, ‘কিছু কোম্পানি প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪২ টাকায় দেয়। কিন্তু গুদাম পর্যন্ত আনতে সিলিন্ডারপ্রতি আরও ৪০-৫০ টাকা খরচ হয়। তাছাড়া সিলিন্ডার পেতে আমাদের প্রায়ই ২-৩ দিন অপেক্ষা করতে হয়।’

‘লোডিং-আনলোডিং, শ্রমিক, পরিবহন এবং অন্যান্য ব্যয়ের কারণে খরচ আরও বেড়েছে। এ কারণে সরকার নির্ধারিত ফি ধরে সিলিন্ডার বিক্রির লাভ তোলা পরিবেশকদের পক্ষে অসম্ভব।’

ওই পরিবেশকের মতে, ওমেরা, বিএম, টোটাল ও আইগ্যাজের মতো কোম্পানিগুলো নির্ধারিত হারে সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও অন্যরা দাম রাখছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০ টাকা।

পরিবেশকরা বাড়তি দাম নিচ্ছেন স্বীকার করেই তিনি বলেন, ‘পুরো বাজারের ওপর মূলত বড় কয়েকটি সরবরাহকারীর প্রভাব আছে।’

মগবাজার এলাকার এক খুচরা বিক্রেতা জানান, পরিবেশকরা বেশ কয়েকমাস ধরে রসিদ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

‘আমরা রসিদ চাইলে তারা আমাদের সিলিন্ডার বিক্রি না করার হুমকি দেন। তাদের কাছ থেকে ২১০০-২২০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হয়। সরকারি রেটে কীভাবে বিক্রি করব,’ প্রশ্ন রাখেন তিনি।

অন্যদিকে এলপিজি আমদানিকারকরাও চলতি মূলধন ও ঋণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় এবং নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে চলার অজুহাত দিয়ে দাম বাড়াচ্ছেন। প্রতি কেজি স্টোরেজ ও বোতলজাতকরণ খরচ ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তাদের প্রস্তাবে জানায়, অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা বিইআরসি ঘোষিত দামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু পরিবর্তনশীল বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম দ্রুত সমন্বয় না করায় তারা সব সময় তা মেনে চলতে পারছেন না।

এ প্রসঙ্গে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি এলপিজি কোম্পানি সিলিন্ডার মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। মুনাফাখোরদের নিয়ন্ত্রণে বাজার। তারা গ্রাহকদের জিম্মি করে রেখেছে। অথচ বিইআরসি নিষ্ক্রিয়। আর এখন দাম বাড়ানোর জন্য আবারও গণশুনানি করা হচ্ছে।’

মজুদদারির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে বিচারিক তদন্ত এবং দোষী সাব্যস্ত কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের আহ্বান জানান তিনি।

উল্লেখ্য, দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

Related Articles

Latest Posts