দৌড়ঝাঁপ-নাচে দক্ষ চীনের রোবট, এখন শুধু ‘বুদ্ধিমান’ হওয়া বাকি

দীর্ঘদিন ধরে দৌড়ানো, নাচা ও ডিগবাজি দেওয়ার মতো সক্ষমতাসম্পন্ন হিউম্যানয়েড রোবট তৈরিতে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে।

তবে এবার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব রোবটকে বুদ্ধিমান করে তোলার চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়েছে। গতকাল সোমবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ বিষয়টি জানা গেছে।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা এসব যন্ত্রকে আরও বিস্তৃত পরিসরের কাজে ব্যবহারযোগ্য করে তুলবে।

এই পরিবর্তনের ফলে ‘এমবডিড এআই’ খাতে বিনিয়োগের জোয়ার তৈরি হচ্ছে।

এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য এমন সফটওয়্যার তৈরি করা, যার মাধ্যমে রোবট চারপাশের পরিবেশ বুঝতে পারবে। প্রতিটি নতুন কাজের জন্য আলাদা করে প্রোগ্রাম করতে বা নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে না, এমন রোবট নির্মাণ করাই লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য অর্জনে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে।

তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইটুজির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের এমবডিড এআই প্রতিষ্ঠানগুলো ৩২২টি চুক্তির মাধ্যমে ৯ হাজার ৩৫০ কোটি ইউয়ান বা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে।

সাংহাইভিত্তিক প্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেনজেন ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা ডারমট ম্যাকগ্রা বলেন, ‘রোবট নির্মাতারা এখন বুঝতে পারছেন, মুনাফা হার্ডওয়্যার থেকে নয়, বরং আসবে এর “মস্তিষ্ক” থেকে।’

স্পিরিট এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা গাও ইয়াং বলেন, ‘রোবটের সামগ্রিক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় মস্তিষ্কই আসলে সবচেয়ে দুর্বল অংশ।’

চীনের শেনজেনভিত্তিক রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্স স্কয়ারের প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের কাজের ভিডিও দেখেই রোবট বিভিন্ন বস্তু ধরার ও নাড়াচাড়া করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে। প্রতিটি কাজের জন্য মডেলটিকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হয় না।

এক্স স্কয়ারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ইয়াং চিয়ান বলেন, ‘আমরা চাই, রোবট যেন শুধু কোডের নির্দেশে নয়, নিজের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেও কাজ করতে পারে।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চ্যাটবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া আর মানুষের মতো দেখতে রোবটকে কাজ শেখানো এক নয়।

ইন্টারনেটের বিপুল পরিমাণ লেখা থেকে প্রশিক্ষণ নেয় চ্যাটবট। এই তথ্যভাণ্ডার প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হচ্ছে।

অন্যদিকে, কোনো বস্তু আঁকড়ে ধরা থেকে শুরু করে নমনীয় তার নাড়াচাড়া করার মতো কাজ শেখাতে রোবটকে বাস্তব কাজের তথ্য, ভিডিও ও সিমুলেশনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিতে হয়।

এ ক্ষেত্রে কিছু চীনা প্রতিষ্ঠান রোবটকে মানুষের কাজ করার ভিডিও দেখাচ্ছে। অন্যরা কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করছে।

আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দুই পদ্ধতির সমন্বয় ঘটাচ্ছে।

রোবটকে নতুন কাজ শেখানোর ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দিয়েছেন জয়ইন টেকনোলজির এইথার রোবট এআই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ঝু মিংশুয়ান। তিনি বলেন, একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, নাগালের বাইরে থাকা আলমারিতে হেডফোন রাখতে পারছিল না একটি রোবট। পরে প্রকৌশলীরা মানুষ কীভাবে কাজটি করে, সেই ভিডিও রোবটটিকে দেখান। এরপর রোবটটি একটি বাক্স আলমারির দিকে ঠেলে নিয়ে যায় এবং সেটির ওপর উঠে কাজটি করার চেষ্টা করে।

রোবটের বুদ্ধিমত্তা তৈরির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

এই উদীয়মান খাত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যন্ত্রের সবচেয়ে কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে পারবে, এ খাতে সেই দেশই এগিয়ে থাকবে।

চীনে বাস্তব কর্মক্ষেত্রেও রোবটের ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশটির ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএটিএল জানিয়েছে, তাদের ঝোংঝৌ কারখানায় ব্যাটারি প্যাক পরীক্ষার সময় স্পিরিট এআইয়ের রোবট নমনীয় তার সংযুক্ত করছে। এ কাজে সফলতার হার ৯৯ শতাংশের বেশি।

রবিয়্যান্ট জানিয়েছে, সাংহাইয়ের দুটি ফার্মেসিতে তাদের রোবট ওষুধের অর্ডার প্রস্তুত করে। তবে পাঠানোর আগে কর্মীরা ওষুধগুলো পরীক্ষা করে দেখেন।

সব মিলিয়ে রোবটকে ‘বুদ্ধিমান ও বিভিন্ন কাজে দক্ষ’ করে তোলার প্রতিযোগিতা বেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

এ বিষয়টি অনেকের জন্যই অম্লমধুর—একদিকে এআই ও রোবটের সমন্বিত অগ্রগতিতে কাজ হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে ‘রোবটরাই সব কাজ করে দিচ্ছে, আমাদের এখন গল্প-কবিতা লেখা ও বিশ্রামের সময়’—এমন ভবিষ্যতের হাতছানি।

Related Articles

Latest Posts