কেন বিশ্বকাপের ৯৮০ স্টিকারের অ্যালবামে নেই নেইমার?

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সমার্থক ছিলেন তিনি। তার পা ছোঁয়া জাদুতে বুঁদ হয়ে থেকেছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের দামামা বাজার ঠিক আগমুহূর্তে এক বিশাল ধাক্কা খেলেন নেইমার। ৩৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড জায়গা পেলেন না পানিনির বিখ্যাত বিশ্বকাপ স্টিকার অ্যালবামে! গত চার আসরের মধ্যে এই প্রথমবার বিশ্বের অভিজাত খেলোয়াড়দের এই তালিকায় জ্বলজ্বল করবে না তাঁর ছবি। এই বাদ পড়া শুধু একটি স্টিকারের অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি যুগের সম্ভাব্য অবসানেরই যেন এক বিষণ্ণ পূর্বাভাস।

গত শনিবার ৯৮০টি স্টিকারের এই বিশাল সংগ্রহের উন্মোচন অনুষ্ঠানে পানিনি নিশ্চিত করে যে, নেইমার এই অ্যালবামে নেই। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের অ্যালবামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও, ২০২৬ সালের অ্যালবামে ব্রাজিলের জন্য বরাদ্দকৃত ১৮টি জায়গার একটিও পাননি সান্তোসের এই তারকা।

ব্রাজিলে পানিনির সিইও রাউল ভালেসিলো ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম গ্লোবোকে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমাদের একটি বিভাগ প্রতিনিয়ত জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং বিশ্বকাপে প্রতিটি খেলোয়াড়ের থাকার সম্ভাবনা গণনা করে। ইনজুরি বা চমকের মতো কিছু পরিবর্তন থাকলেও চূড়ান্ত নির্বাচন এই মানদণ্ডেই হয়। যদি কোনো খেলোয়াড় ডাক না পান বা সেই মুহূর্তে জাতীয় দলের হয়ে ভালো পারফর্ম না করেন, তবে তার অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কমে যায়।’

পানিনি কেবল বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিলেও, বিশ্বকাপের মূল দলে কে থাকবেন সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে ব্রাজিলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির ওপর। আগামী ১৮ মে তিনি তার চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করবেন। গুঞ্জন রয়েছে, আনচেলত্তি দলের খেলোয়াড়দের শারীরিক ফিটনেসের জন্য অত্যন্ত উঁচু একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন, যা নেইমারের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রাইও একই শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, ‘সে দলে এলে একটা প্রভাব তো ফেলবেই। তবে আনচেলত্তি একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কোচ; তিনি বুঝতে পারবেন নেইমার দলে আদৌ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না। নেইমার এখন নিজের সেরা ছন্দে নেই; তাকে অনেক শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সে তার সেরা ফর্মে ফিরতে পারছে না, সে গতি হারিয়েছে। হ্যাঁ, সে এখনও দুর্দান্ত পাস দেয়, সে একজন তারকা, কিন্তু আমার মনে হয়, ঠিক এই মুহূর্তে তার সেই আগের মতো চূড়ান্ত লেভেলটা আর নেই।’

সাম্প্রতিক স্কোয়াডগুলোতে নেইমারের অনুপস্থিতিই তার স্টিকার অ্যালবামে জায়গা না পাওয়ার প্রধান কারণ। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই অভিশপ্ত রাতে এসিএল ইনজুরিতে পড়ার পর থেকেই জাতীয় দলের বাইরে তিনি। ২০২৫ সালে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরে এলেও, যে বিস্ফোরক ফর্ম তাকে একসময় বিশ্বের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় বানিয়েছিল, সেটি আর তিনি পুরোপুরি ফিরে পাননি।

ভালেসিলো জানান, ব্রাজিলের অংশের স্টিকার উৎপাদনের কাজ মূলত ২০২৫ সালেই শুরু হয়েছিল। দল বাছাইপর্ব পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছবিগুলো উৎপাদনের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। রদ্রিগো বা এস্তেভাওয়ের মতো খেলোয়াড়রা সাম্প্রতিক সময়ে ইনজুরিতে ভুগলেও, সম্ভাবনা গণনার সময় তাদের চূড়ান্ত স্কোয়াডে থাকার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত ধরা হয়েছিল, যা ইনজুরিতে জর্জরিত নেইমারের ক্ষেত্রে হয়নি।

নেইমার যখন মাঠের বাইরে বসে দেখছেন, পানিনি তখন তাদের নজর ঘুরিয়েছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভা এবং নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দিকে। আগামী ৩০ এপ্রিল বাজারে আসছে ব্রাজিলিয়ান সংস্করণের এই অ্যালবাম। সেখানে রক্ষণে দেখা যাবে অ্যালিসন, বেন্তো, মার্কিনিয়োস, এদের মিলিতাও, গ্যাব্রিয়েল মাগালহেস, দানিলো এবং ওয়েসলিকে। মিডফিল্ড এবং আক্রমণে জায়গা করে নিয়েছেন ক্যাসেমিরো, লুকাস পাকেতা, ব্রুনো গুইমারেস, লুইজ হেনরিক, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, জোয়াও পেদ্রো, ম্যাথিউস কুনহা, গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, রাফিনিয়া এবং তরুণ সেনসেশন এস্তেভাও।

১৮ মে কার্লো আনচেলত্তি কোনো বড় চমক দেবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক মহাতারকাকে ছাড়াই এগিয়ে চলেছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবের প্রস্তুতি।

 

Related Articles

Latest Posts