এক সময় কানাডার যুব দল ও মূল দল দুটোতেই খেলেছেন শমিত সোম। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের মাঝমাঠের বড় ভরসা। এক বছর আগে লাল-সবুজ জার্সি গায়ে অভিষেক হওয়া শমিত এখন দলের ট্যাকটিকাল পরিকল্পনার মধ্যমণি। শমিতের জন্ম যেখানে, সেই কানাডা এবার ফিফা বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক। বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের স্মৃতি, এবারের আসর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী, বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে শমিত কথা বলেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সামসুল আরেফীন খানের সঙ্গে।
দ্য ডেইলি স্টার: প্রথমবারের মতো সহ-আয়োজক হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে কানাডা। যে দেশে আপনার জন্ম, সে দেশকে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে দেখে কেমন লাগছে?
শমিত: ভীষণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে, কানাডা জাতীয় দলের অংশ ছিলাম এক সময়, ফুটবল বিশ্বে দেশটির উত্থানের অংশীদারও ছিলাম।
দ্য ডেইলি স্টার: কানাডার হয়ে এই বিশ্বকাপে খেলছে এমন অনেকের সঙ্গে তো আপনি একসাথে খেলেছেন?
শমিত: হ্যাঁ, বেশিরভাগের সাথেই আমি বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলেছি। মন্ট্রিয়লেও কেউ কেউ আমার সতীর্থ ছিল। আমি অবশ্যই কানাডা ও আমার আগের সতীর্থদের সমর্থন করব। চাইবো যেন কানাডা নক-আউট পর্বে উঠতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টার: আপনার কী মনে হয়, এই টুর্নামেন্ট কানাডার ফুটবল সত্ত্বাকে কীভাবে গড়ে দিতে পারে? কানাডার ফুটবল এই পর্যন্ত আসার যাত্রা থেকে বাংলাদেশই বা কী শিখতে পারে?
শমিত: আমি মনে করি এই বিশ্বকাপ আয়োজন কানাডার ফুটবল সংস্কৃতিকে অনেকটাই উন্নত করবে। এছাড়া সামগ্রিকভাবে গোটা উত্তর আমেরিকার ফুটবলের উপরেও দারুণ প্রভাব ফেলবে। ফুটবলে কানাডার সাম্প্রতিক যে সাফল্য, আমার মনে হয় বাংলাদেশের সেটা অনুসরণ করার মতো যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তবে এর জন্য জাতীয় দলের উন্নতি করার ব্যাপারে সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। তাহলেই আমরা দুর্দান্ত কিছু অর্জন করতে পারব।
দ্য ডেইলি স্টার: চট করে বিশ্বকাপের সাথে আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো জেনে নেওয়া যাক। আপনার বিশ্বকাপ দেখার প্রথম স্মরণীয় স্মৃতি, আর সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত কোনটি?
শমিত: আমার প্রথম বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি ২০০৬ সালের। জিনেদিন জিদানের ওই বিতর্কিত কাণ্ড, জার্মানির বিশ্বকাপা আয়োজন করা- ওই সময় থেকেই আমি প্রথম জার্মানিকে সমর্থন করা শুরু করি। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ বিশ্বকাপ আমি ভীষণ উপভোগ করেছি। ওই বিশ্বকাপের আবহ সত্যিই অন্যরকম ছিল। কিছু মনে রাখার মতো মুহূর্তও ছিল- হামেস রদ্রিগেজের ওই ভলি থেকে করা গোল, নেইমারের ইনজুরি, আর জার্মানির ব্রাজিলকে বড় ব্যবধানে হারানো।
দ্য ডেইলি স্টার: এই বিশ্বকাপে কাকে সমর্থন করছেন?
শমিত: নিরপেক্ষ সমর্থক হিসেবে ব্রাজিল আর পর্তুগালকে সমর্থন করব।
দ্য ডেইলি স্টার: আপনার চার সেমিফাইনালিস্ট কারা কারা?
শমিত: ব্রাজিল, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড আর সেনেগাল। আমার মনে হয় এবার ব্রাজিল জিতবে।
দ্য ডেইলি স্টার: কোন কোন ফুটবলারদের খেলা দেখতে বিশেষভাবে মুখিয়ে আছেন?
শমিত: পর্তুগালের ভিতিনহা আর ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইস। দুজনই এই মুহূর্তে সেরা ফর্মে আছে। বিশ্বকাপে কেমন খেলে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। এছাড়া ফ্রান্সের ডেম্বেলেও দারুণ ফর্মে আছে। উঠতি খেলোয়াড়দের মধ্যে আর্জেন্টিনার নিকো পাজের খেলা দেখতে মজা লাগবে আশা করছি।
দ্য ডেইলি স্টার: মাঠে বসে কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচ দেখার পরিকল্পনা আছে?
শমিত: এখনও ঠিক করিনি মাঠে বসে দেখব না কি বাসা থেকেই উপভোগ করব। দেখা যাক।
দ্য ডেইলি স্টার: প্রায় এক বছর হতে চললো বাংলাদেশের হয়ে আপনার অভিষেক হয়েছে। ছয়টি ম্যাচও খেলে ফেলেছেন। এখন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা কেমন?
শমিত: দারুণ অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত… সবাই এত সহযোগিতাপূর্ণ আর আমাকে এত সহজে নিজেদের একজন করে নিয়েছে, এটাই আমাকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে পারফর্ম করার অনুপ্রেরণা যোগায়। আমার মনে হয় গত বছর আমরা যে মানের ফুটবল খেলেছি সেই অনুযায়ী ফলাফল আসেনি। কিন্তু ফুটবল আসলে এমনই। আমি আশাবাদী যে আমরা উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে পারব, এবং সেই সাথে সাফল্যও আনতে পারব।
দ্য ডেইলি স্টার: জাতীয় দলের নতুন কোচ হিসেবে থমাস ডুলির আগমনকে কীভাবে দেখছেন?
শমিত: আমার মনে হয় কোচ হিসেবে দারুণ একজনকে নিয়োগ দিয়েছে ফেডারেশন (বাফুফে)। খেলোয়াড় এবং কোচ দুই ভূমিকাতেই তাঁর অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর সাথে কাজ করতে ও নতুন কিছু শিখতে মুখিয়ে আছি।
দ্য ডেইলি স্টার: এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বেশ কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন। উত্তর আমেরিকায় আপনার যে ফুটবলের অভিজ্ঞতা, তার সাথে এশিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলের পার্থক্য কোথায় দেখছেন?
শমিত: দুই জায়গার ফুটবল কাঠামো আর পরিবেশ আলাদা। উত্তর আমেরিকার ক্লাব ফুটবলকে যদিও এখনো সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না, কিন্তু খেলার মান বেশ শক্তিশালী। ওখানকার ক্লাব ফুটবলের চেয়ে এখানে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতা আমার কাছে একদমই ভিন্ন মনে হয়েছে। এশিয়ায় ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা, এবং প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় দল নিয়ে যেভাবে গর্ববোধ করে, সেটা বেশ ভালো ভাবে বোঝা যায়। এ ধরণের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আবহে খেলতে আমি পছন্দ করি।
দ্য ডেইলি স্টার: বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা তো অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। সমর্থকেরা নিজেদের পছন্দের দেশের পতাকা টানায়। স্থানীয় লোকজনের ফুটবল নিয়ে এই প্যাশনকে কীভাবে দেখেন?
শমিত: বাংলাদেশি সমর্থকেরা অনবদ্য। নিজের দেশ আর অন্য যে দেশকে সমর্থন করে দুটোর প্রতিই তাদের তীব্র আবেগ কাজ করে। এ ধরণের সমর্থন আমাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের উন্নত করতে অনুপ্রেরণা দেয়, যা দিনশেষে বাংলাদেশ ফুটবলের জন্যই মঙ্গলজনক।
দ্য ডেইলি স্টার: এদেশের কোটি কোটি মানুষ স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলবে। জাতীয় দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনার কী মনে হয়, বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ কেমন হওয়া উচিত?
শমিত: আমি মনে করি এটা অবশ্যই সম্ভব, এবং নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। ফেডারেশন এবং পুরো দেশ মিলে একসাথে সঠিক দিশায় আছে। পেশাদারত্বের উন্নতি হচ্ছে, মাঠ ও মাঠের বাইরে দুই জায়গায়ই মান আরও উন্নত হচ্ছে। স্থানীয় লীগগুলোতে বিনিয়োগ করাটা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে করে জাতীয় দলে ঢুকতে হলে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এতে করে দলের খেলার মানও আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ফুটবলকে শক্তিশালী দেখতে চাইলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

