ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য গত বছর লালমনিরহাটে দেশের প্রথম ‘অটোমেটিক টার্নটেবিল’ উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু পরদিনই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি আজও ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
উত্তরাঞ্চলের এই রেল বিভাগে এখনো ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর নিজস্ব ব্যবস্থা নেই। প্রতি দুই থেকে তিন মাস পরপর ইঞ্জিন ও কোচগুলো ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের টার্নটেবিলে ঘুরিয়ে আবার লালমনিরহাটে আনতে হচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি অপচয় হচ্ছে অর্থও।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে এই টার্নটেবিলটি নির্মাণ করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর পর ২০২৫ সালের ২৬ মে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু পরদিনই অটোমেশন ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর থেকে এটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।
রেলওয়ে প্রকৌশলীরা জানান, ট্রেনের একটি ইঞ্জিন বা কোচ দীর্ঘদিন একই দিকে চললে চাকার ওপর এক দিকে বেশি চাপ পড়ে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ইঞ্জিন ও কোচ ঘুরিয়ে দিলে চাকার ওপর সমান চাপ পড়ে, ফলে চাকার ক্ষয় কম হয় এবং যন্ত্রাংশের আয়ু বাড়ে।
এ ছাড়া অধিকাংশ লোকোমোটিভের চালকের কেবিন একদিকে বেশি কার্যকর থাকে। টার্নটেবিলে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে চালকের কেবিন সামনের দিকে রাখা হলে চালক সহজে রেললাইন ও সিগন্যাল দেখতে পারেন, এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।
কিন্তু লালমনিরহাটে সেই সুবিধা না থাকায় ইঞ্জিন ও কোচ কমলাপুরের টার্নটেবিলে নিয়ে ঘুরিয়ে আবার ফিরিয়ে আনতে হয়।
লোকোমাস্টার সাইফুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘টার্নটেবিলটি চালু থাকলে ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য আমাদের কমলাপুরে যেতে হতো না। ইঞ্জিনের ক্যাব সাইড সব সময় সামনে থাকলে আমরা রেললাইন ও সিগন্যাল আরও ভালোভাবে দেখতে পারি।’
অটোমেটিক টার্নটেবিলটি নির্মাণ করেছিলেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের সাবেক বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ডিএমই–ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) তাসরুজ্জামান বাবু। এর জন্য তিনি ২০২৪ সালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ‘শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক’ সম্মাননাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
দেশে একসময় মোট ১২টি টার্নটেবিল ছিল, যেগুলোর সবই ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। এর মধ্যে লালমনিরহাটে থাকা একটি টার্নটেবিল প্রায় ৩০ বছর আগে বিকল হয়ে যায়।
লালমনিরহাট রেলওয়ের বর্তমান বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) ধীমান ভৌমিক বলেন, উদ্বোধনের পরদিনই টার্নটেবিলের অটোমেশন সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দেয়। সমস্যা হচ্ছে, এটি ভারী ইঞ্জিনের ওজন বহন করতে পারছে না।
তিনি জানান, একটি ইঞ্জিনের ওজন সাধারণত ৭০ থেকে ৯০ টন এবং কোচের ওজন ২০ থেকে ৩০ টন হয়। বর্তমান টার্নটেবিলটি ইঞ্জিনের পূর্ণ ভার নিতে পারছে না। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। টার্নটেবিলটি আরও শক্তিশালী করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোহাম্মদ তসলিম আহমেদ খান বলেন, ‘প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে টার্নটেবিলটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে কমলাপুর স্টেশনে ইঞ্জিন ও কোচ ঘুরিয়ে আনতে রেলওয়ের অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে। তাই লালমনিরহাটের টার্নটেবিলটি চালু করা জরুরি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

