ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক বাকযুদ্ধও জোরালো হয়েছে।
একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করার দাবি করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়া বলছে, এ হামলা শান্তি আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে।
একই সময়ে চীন অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ‘বিপজ্জনক খাদে’ ঠেলে দিচ্ছে। আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে নতুন করে হামলা চালালে ‘আরও শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক সক্ষমতার বেশিরভাগই ধ্বংস করে দিয়েছে।
তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো ধরনের ফি আরোপের ধারণা তার পছন্দ নয়। তবে ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে।
ট্রাম্প আরও জানান, বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে বিবেচনাধীন রাশিয়াবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা বিলে ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
🎥وزیر خارجهٔ روسیه: حملات آمریکا به ایران نقض «یادداشت تفاهم» است
لاوروف حملات آمریکا به ایران را نقض یادداشت تفاهم میان ۲ طرف خواند و تاکید کرد، این اقدامات در را به روی هرگونه توافق میبندد. https://t.co/s8nqYuuMVT pic.twitter.com/SsVQ86zuIc
এদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার ভাষায়, এই সংঘাত কোনো সমাধান বয়ে আনবে না, বরং ইরান এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লাভরভ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে ওয়াশিংটনের দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি সুন লেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও জটিল করে তোলার অভিযোগ করেছেন।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যেই ওয়াশিংটন ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছে, যা পুরো অঞ্চলকে আবারও ‘বিপজ্জনক খাদে’ ঠেলে দিয়েছে।
তার দাবি, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের দায় রয়েছে এবং গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনেও ওয়াশিংটনের ভূমিকা রয়েছে।
এর জবাবে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ অভিযোগ করেন, ইরান এবং চীনের কিছু প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘের ২২১৬ নম্বর প্রস্তাব লঙ্ঘন করে হুতি গোষ্ঠীর ওপর আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করছে।
এ অভিযোগকে ঘিরে দুই পরাশক্তির প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে চীনের প্রতিনিধি ওয়াশিংটনকে নিজেদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে উত্তেজনা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েলে নতুন করে হামলা চালানো হলে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেওয়া হবে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ডিমোনায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর হামলা করেও পার পেয়ে যাওয়ার দিন শেষ। আগের অভিযানের পুনরাবৃত্তি হবে না, এবার প্রতিক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি শক্তিশালী।’
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে আবারও অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বুশেহর বন্দর এলাকাও লক্ষ্যবস্তু হয়। এই বন্দরেই দেশটির একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।
এরপর ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম ও কিশ দ্বীপসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্দিমেশক শহরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দ্বীপটির গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে, অন্তত একটি বিস্ফোরণ যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষেপ করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ঘটেছে। তবে এতে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে কিশ দ্বীপে একটি পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থাপনার কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে বলে জানিয়েছে ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা। সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বা কোনো হতাহতের তথ্য এখনও জানা যায়নি।
এ ছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, খুজেস্তান প্রদেশের আন্দিমেশক শহরেও একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিস্ফোরণের কারণ বা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
এসব হামলার জবাবে গত কয়েক দিনে ইরান অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে মঙ্গলবার নতুন করে হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে বাহরাইন ও জর্ডান। দুই দেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একাধিক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো ধ্বংস করে। এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বাহরাইনের কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, ইরানের নতুন হামলার সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

