দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন করছেন দেশের বিভিন্ন জায়গার চা শ্রমিকরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। দাবি পূরণ না হলে ধর্মঘটের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন শ্রমিকেরা।
গত কয়েক দিনে কয়েকটি চা-বাগানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। শ্রমিকেরা নিজ নিজ বাগানের প্রশাসনের কাছে তাদের দাবির তালিকাও দিয়েছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিপ্লব মাদ্রাজি পাশী বলেন, চলতি মাসে দৈনিক মজুরি ১৯৬ টাকা নির্ধারণ করে এর সঙ্গে ৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা শ্রমিকদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। তার মতে, ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের যে আন্দোলন চলছে, সেটি দুর্বল করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেলেও বাংলাদেশ চা অ্যাসোসিয়েশন একতরফাভাবে ১৯৬ টাকা মজুরি নির্ধারণ করেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। আর ২০২২ সালের পর থেকে শ্রমিকদের মজুরি আর বাড়ানো হয়নি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক পরেশ কালিন্দী বলেন, গত ৬ আগস্ট শ্রীমঙ্গলে ইউনিয়নের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিল, নতুন মজুরি বোর্ড গঠন, সবার জন্য একটি নির্ধারিত মজুরি এবং ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হয়।
গত ৯ আগস্ট সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানের শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। পরে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। চার দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রশাসনকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন। একই সঙ্গে ২৩টি চা-বাগানের শ্রমিকেরা এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে চা-বাগানের মালিকেরা সতর্ক করে বলেছেন, চা উৎপাদনের ভরা মৌসুমে ধর্মঘট হলে শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
এমআর খান চা-বাগানের মালিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চা উৎপাদন এমনিতেই কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে ধর্মঘট হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং শিল্পটি বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
সিলেট অঞ্চলের বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ সিবলী বলেন, চা-বাগানে এ ধরনের ধর্মঘট আমাদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করছি। শ্রমিক নেতারা আমাদের চা-বাগানগুলোতে চিঠি দিয়ে ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা চিঠি পেয়েছি এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।
শ্রীমঙ্গলের বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ইউনিয়ন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। আর মজুরির বিষয়টি মালিকপক্ষ বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক বিশু প্রসাদ গোয়ালা বলেন, চা শ্রমিকেরা তাদের মৌলিক নাগরিক সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, মজুরি বাড়ানোর দাবিতে চলতি মাসের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকেরা প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কাজ বন্ধ রাখছেন। ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবিতে ইউনিয়ন চা-বাগানের মালিকদের চিঠিও দিয়েছে বলে তিনি জানান।
যুগ্ম আহ্বায়ক আকাশ দুশাদ বলেন, তারা কয়েক দিন ধরে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকটের কারণে শ্রমিকদের পরিবারের চিকিৎসার খরচ ও সন্তানদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেককে উচ্চ সুদে ধার করতে হচ্ছে।
চা শ্রমিক ঐক্যের উপদেষ্টা সঞ্জয় চন্দ্র দাস বলেন, একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। এই টাকা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানো সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, একজন চা শ্রমিককে দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা কাজ করতে গিয়ে হাজার হাজার ক্যালরি শক্তি খরচ করতে হয়। তাই দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি যৌক্তিক।
২০২৩ সালে জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে চা শ্রমিকদের মূল মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বাড়ানোর কথা বলা হয়। শ্রমিক নেতারা এই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে নতুন মজুরি কাঠামো চালুর দাবি জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক ও শ্রমিক নেতাসহ ১৩৫ জন নাগরিক চা শ্রমিকদের ৫০০ টাকা দৈনিক মজুরি, ইউনিয়ন নির্বাচন এবং জমির অধিকারসহ বিভিন্ন দাবির প্রতি সংহতি জানিয়েছেন।

