দেশের বেসামরিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের এক-চতুর্থাংশের বেশি খালি রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সরকারি সেবায়। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে হতাশ হচ্ছেন লাখো চাকরিপ্রার্থী।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রণীত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০২৫’-এর খসড়া অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বেসামরিক সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ১৯ লাখ ৮৬ হাজার পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থাৎ ৫ লাখ ২২ হাজার পদ এখনো শূন্য।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সরকার শূন্য পদ পূরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি—দুই বিষয়েই গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগে যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তা কমাতে কার্যকর উপায়ও খুঁজে দেখা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, এই পাঁচ লাখ শূন্য পদ পূরণ হলে প্রায় পাঁচ লাখ পরিবারের ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। একদিকে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে হাজারো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাই দ্রুত এসব পদে নিয়োগে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পাঁচ লাখের বেশি শূন্য পদের বেশির ভাগই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থায়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই নিয়মিত ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ আদালতে গড়ালে তা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, জ্যেষ্ঠতা-সংক্রান্ত মামলার কারণে গত ১৭ বছর ধরে দেশের ৩৪ হাজার ৫০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এতে দেশের ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নেত্রকোনার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শিমুল হাসান বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় দুটি সমস্যা তৈরি হয়। একজন শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং এতে তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন না। আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের অনেক বিষয়ে প্রশিক্ষণ না থাকায় অন্য শিক্ষকদেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়।
এদিকে বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩২৯টি পৌরসভায় প্রায় ৫০ হাজার অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩১ হাজার ১৪২টি পদ শূন্য।
স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জনবল সংকটের কারণে অনেক পৌরসভা নিয়মিতভাবে সড়ক পরিষ্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। কর্মকর্তা পর্যায়ের শূন্য পদ প্রশাসনিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, অনেক পৌরসভা নিজস্ব আয় দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না এবং সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেও স্থানীয় সরকার বিভাগ পৌরসভাগুলোর নিয়োগকে সব সময় অগ্রাধিকার দেয় না।
বেকারদের হতাশা
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে স্নাতক শেষ করা মো. সাব্বির আহমেদ গত তিন বছর ধরে বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও মাসের পর মাস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না।
রাজধানীতে একটি মেসে থাকা সাব্বির বলেন, বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দুই দফা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও এখনো পরীক্ষা হয়নি। এরই মধ্যে গত মাসে একই ধরনের পদের জন্য আবারও নতুন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক। অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের একজনই বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী স্নাতক বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা চাকরিপ্রার্থীদের হতাশার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর পরিবার চেয়েছিল আমি দ্রুত চাকরি করে সংসারে অবদান রাখব। কিন্তু চাকরির বাস্তবতা আমাকে তীব্র মানসিক চাপে ফেলেছে।
কেন হচ্ছে দেরি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক দপ্তর ও সংস্থার প্রধানই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে আগ্রহী নন।
তাদের ভাষ্য, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা সাধারণত অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তাদের অনেকেই সচিব পদে পদোন্নতির বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের তদবির ও চাপ সামলাতে হয়। ফলে তারা এ ধরনের ঝামেলায় যেতে চান না।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করে কাজ চালায়। এতে দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত নিজেদের পছন্দের লোক নিয়োগের সুযোগ থাকে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর সচিবালয়ে সৃষ্ট অস্থিরতাও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
করণীয় কী
সাবেক সচিব আশফাকুর রহমান মনে করেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্রুত জনবল নিয়োগ সম্ভব।
তার মতে, কোন প্রতিষ্ঠানে বছরে কতটি পদ শূন্য হলো এবং সেগুলো পূরণে কী উদ্যোগ নেওয়া হলো—এ নিয়ে কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। অযৌক্তিকভাবে পদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়নে প্রভাব পড়বে—এমন বিধান করা যেতে পারে।
অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা একজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
তার ভাষায়, এই টাস্কফোর্স নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তদারকি করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের নিয়োগ কার্যক্রমের জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোকে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপও দেবে।

