২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও জিডিপির শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপের ফলাফলে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহর এলাকার ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দুই ধাপের স্তরায়িত গুচ্ছ নমুনা পদ্ধতিতে এ জরিপ করেছে টিআইবি।
জরিপ অনুযায়ী, একটি খাতে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে ও ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার বেড়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ঘুষের শিকার পরিবারের হার বেড়েছে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ।
জরিপের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের ৫ হাজার ৬৮০ টাকা থেকে ২০২৫ সালে কমে ৫ হাজার ১২৪ টাকায় নেমে এসেছে। তবে স্বাস্থ্যসেবায় টিকিট সংগ্রহ ও কৃষি খাতে সার পাওয়ার মতো সেবায় ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের হার দ্বিগুণ থেকে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ, এসব খাতে তুলনামূলক কম অঙ্কের হলেও ঘুষ লেনদেনের ঘটনা অনেক বেশি ঘটছে।
অন্যদিকে, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বেড়েছে মূলত নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির কারণে। এ হার প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি পরিবার বছরে গড়ে তাদের মোট আয়ের ১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘুষ দিতে ব্যয় করেছে। তবে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ পাঁচটি খাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারগুলোর জন্য তা ৩ দশমিক ২ শতাংশ।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ১৩টি পরিবারের ঘুষ বাবদ ব্যয় তাদের বার্ষিক আয়ের চেয়েও বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যয় বার্ষিক আয়ের পাঁচ থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি সবার জন্যই ক্ষতিকর, তবে একইসঙ্গে বৈষম্যমূলক। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তারা দুর্নীতির ফলে লাভবান হলেও, এর নেতিবাচক প্রভাব পরে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
তিনি বলেন, জরিপেও উঠে এসেছে গ্রামাঞ্চলে মানুষ বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর দুর্নীতির বোঝা তুলনামূলকভাবে উচ্চতর আয়ের খানার তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা। জরিপে আমরা দেখেছি, সিংহভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, দুর্নীতির প্রতিকার হয় না, বরং ব্যাপকতা বাড়ছে। প্রতিকার ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি, সেটিকে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে।
‘জরিপের উত্তরদাতাদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ সংস্থাটি সম্পর্কে জানলেও, দুদকে অভিযোগ করেছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ দুদকের ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবহ। প্রতিষ্ঠানটির দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে, এর ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে’, বলেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বর্তমানে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত স্থবির, থেকেও নেই, দীর্ঘ প্রায় চার মাস ধরে কমিশনারদের পদশূন্য। এ অবস্থার দায় সরকারের নেওয়া উচিত এবং অবিলম্বে যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার মাধ্যমে এমন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া, যেন প্রতিষ্ঠানটির ওপর যে আস্থার সংকট এই জরিপে উঠে এসেছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

