রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে ময়মনসিংহে এসেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ভ্রমণের শতবর্ষ পূর্ণ হলেও কবির স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্থান এখনো সংরক্ষিত হয়নি।
জেলার সচেতন নাগরিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও কবি-সাহিত্যিকেরা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। কারণ তার এই ভ্রমণ এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
লেখক স্বপন ধর বলেন, ময়মনসিংহে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণের স্মৃতিবিজড়িত উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে— ময়মনসিংহ শহরের আলেকজান্ডার ক্যাসেল যা ‘লোহার কুঠির’ বা ‘রংমহল’ নামেও পরিচিত, শশী লজ, বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সিটি কলেজিয়েট স্কুল, আনন্দমোহন কলেজ ও ব্রাহ্মমন্দির।
এ ছাড়া ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি জমিদারবাড়িও তার ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থান বলে জানান তিনি।
এই লেখক বলেন, রবীন্দ্রনাথের ময়মনসিংহ ভ্রমণের শত বছর পার হয়ে গেলেও জেলার বাইরের কোনো মানুষের পক্ষে এসব স্থান চিহ্নিত করা কঠিন। বিভিন্ন সময়ে এসব স্থান যথাযথভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ ভ্রমণ করেছিলেন। তখন মুক্তাগাছার জমিদাররা আলেকজান্ডার ক্যাসেল প্রাঙ্গণে একটি বটগাছের নিচে তাকে সংবর্ধনা জানান। বর্তমানে স্থানটি ‘রবীন্দ্র বটমূল’ নামে পরিচিত।
আর ১৪ কক্ষবিশিষ্ট আলেকজান্ডার ক্যাসেল এতদিন সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের (পুরুষ) গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে মাত্র তিন মাস আগে কলেজ কর্তৃপক্ষ স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে বলে জানান কলেজের অধ্যক্ষ রিজিয়া সুলতানা।
সেই সফরে ময়মনসিংহ পৌরসভা, ময়মনসিংহ নাগরিক সমাজ ও মহিলা সমিতিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবিকে সংবর্ধনা দেয়।
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র এবং তৎকালীন আঠারবাড়ির জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আঠারবাড়ি জমিদারবাড়ি ভ্রমণ করেন।
সেখানে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী ২১ একর জমির ওপর অবস্থিত মূল প্রাসাদের পাশের কাছারিবাড়ির উদ্বোধন উপলক্ষে কবির হাতে প্রতীকী ‘সোনার চাবি’ তুলে দেন।
একসময় ওই কাছারিবাড়িতে আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। নতুন ভবন হওয়ার পর গত পাঁচবছর ধরে সেখানে ক্লাস হচ্ছে না। বর্ষাকালে কাছারিবাড়ির ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। বর্তমানে একরকম পরিত্যক্ত রয়েছে বলে জানান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহিদুর রহমান।
রবীন্দ্রনাথের ময়মনসিংহ সফরের শতবর্ষ উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক মো. মামুনুল ইসলাম বলেন, রবীন্দ্রনাথের আগমন ময়মনসিংহের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আজও তার সেই গৌরবময় উপস্থিতির স্মৃতি আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
তিনি বলেন, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে আরও সমৃদ্ধ করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে আমাদের নিত্যজীবনের নানা অনুষঙ্গে ধারণ করতে হবে। তার সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবতাবাদী আদর্শের নিয়মিত চর্চা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিতকে আরও শক্তিশালী করবে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, বাংলার জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশে রবীন্দ্রনাথের দেশপ্রেম, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শের চর্চা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ময়মনসিংহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় সেগুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই এসব স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানে না।
বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাসিমা আক্তার জানান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রমণ স্মরণে বিদ্যালয়ের ভেতরে বা বাইরে কোনো স্মৃতিফলক নেই। বিশ্বকবির এই ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতে আমরা বিদ্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিফলক স্থাপনের পরিকল্পনা করছি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আলেকজান্ডার ক্যাসেল ও শশী লজ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হলেও রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ স্মরণে সেখানে এখনো কোনো স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়নি।

