১৩ বছর বয়সে যখন আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনের বার্সেলোনায় পৌঁছান লিওনেল মেসি, স্বপ্নটা তখন যেন আচমকা এক কঠিন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল।
বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের এক নতুন দেশ, নতুন জীবন। মানিয়ে নিতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে উঠছিলেন কিশোর মেসি। তার বাবা হোর্হে মেসির সংগ্রামটাও কম ছিল না। দুজন আলাদা ঘরে গিয়ে চুপচাপ কাঁদতেন। তারপর একে অন্যের সামনে এসে এমন ভাব করতেন— যেন কিছুই হয়নি।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি পরে বলেছিলেন, ‘বার্সেলোনায় আসার পর আমি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে একা একা কাঁদতাম। বাবাও একই কাজ করতেন— হয়তো আমার অগোচরে, নয়তো তিনি ভাবতেন আমি টের পাচ্ছি না। আমরা দুজনই ভালো থাকার অভিনয় করতাম, কিন্তু ভেতর থেকে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল।’
দুই দশকেরও বেশি সময় পর ফুটবল মাঠে আবারও কাঁদতে দেখা যায় মেসিকে। এবার কোটি কোটি দর্শকের সামনে। পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সেই একই মানুষ।
সবশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর কান্না আটকাতে পারেননি মেসি। পরে জানিয়েছিলেন, ‘কঠিন কিছু দিন’ কাটছিল তার। আরও উল্লেখ করেছিলেন, সেই কান্নার সঙ্গে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই।
এর পরপরই প্রকাশ্যে আসে তার বাবা হোর্হে মেসির শারীরিক অসুস্থতার খবর। চারপাশের নানা ধরনের গুঞ্জনের মধ্যে তখন সংবাদমাধ্যমের কাছে কিছুটা ‘সংবেদনশীলতা’ প্রত্যাশা করেছিল মেসিদের পরিবার। রোজারিওর হাসপাতালে তখন চলছিল হোর্হের চিকিৎসা।
মেসির সেই কান্নার ভেতরের দৃশ্যটা এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াযজ্ঞে পুরো দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে খেলার মাঝেও তিনি খুবই ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর সেখানে জড়িয়ে ছিল সেই মানুষটি— যিনি জীবনের প্রথম দিন থেকে তার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন।
হোর্হে ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন আর্জেন্টিনার স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে। পরম প্রিয় বাবাকে হারিয়েছেন মেসি।
ফুটবলের দুনিয়ার কাছে তিনি ছিলেন লিওনেল মেসির বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট। কিন্তু লিওর কাছে তিনি ছিলেন সেই মানুষ— যিনি রোজারিও থেকে বার্সেলোনা যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, সব ঝড় একসাথে সামলেছিলেন এবং ইচ্ছে করলেই ফিরে যাওয়ার সহজ পথটা খোলা থাকা সত্ত্বেও ছেলের পাশে থেকে গিয়েছিলেন।
ধাতু কারখানার সাবেক শ্রমিক হোর্হে ছিলেন আর্জেন্টিনায় ছেলের প্রথম কোচ। ‘আবান্দেরাদো গ্রান্দোলি’ নামের যে স্থানীয় ক্লাবে মেসির ফুটবলের হাতেখড়ি, বিশ্ব এই নামটি জানার অনেক আগে থেকেই সেখানে ছিলেন হোর্হে।
২০০০ সালে বার্সেলোনা থেকে যখন ডাক আসে, তখন স্থায়ী চাকরি, স্ত্রী সেলিয়া ও অন্য তিন সন্তানকে রেখে ১৩ বছরের মেসিকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমান হোর্হে। সিদ্ধান্তটা ছিল এক বিশাল ঝুঁকি।
অচেনা এক দেশে ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ কাজে লাগাতে কিশোর মেসি পেছনে ফেলে এসেছিলেন পরিচিত সবকিছু। তার গ্রোথ হরমোনজনিত চিকিৎসার খরচ নিয়ে পরিবার আগে থেকেই অনিশ্চয়তায় ছিল। স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা সেখানে আশার আলো দেখালেও তা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো ছিল না।
শুরুর দিনগুলো ছিল ভীষণ কঠিন। হোর্হে ও লিওনেল ভুগছিলেন একাকীত্বে, দেশ ছেড়ে দূরে থাকার কষ্ট দুজনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। সামনে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়েও তারা ছিলেন অনিশ্চিত। একপর্যায়ে হোর্হে ছেলেকে জিজ্ঞেসও করেছিলেন, সে কি খেলা চালিয়ে যেতে চায় নাকি আর্জেন্টিনায় ফিরে যাবে।
মেসি বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতি যখন কঠিন হয়ে উঠেছিল, বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি কী করতে চাই— চালিয়ে যেতে চাই, নাকি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। আমি লড়াই চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, তাই তিনিও আমার পাশে থেকে গেলেন।’
সেই একটা সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বদলে দিয়েছে ফুটবল ইতিহাসেরই গতিপথ।
পরিবারের বাকি সদস্যরা আর্জেন্টিনায় ফিরে গেলেও স্পেনেই থেকে যান হোর্হে। বার্সার একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় ছেলেকে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করা থেকে শুরু করে দলটিতে মেসির প্রথম পেশাদার চুক্তি সম্পন্ন করার পুরোটা কাজ করেন তিনি।
পরবর্তীতে তিনি হন মেসির একমাত্র এজেন্ট ও প্রতিনিধি। বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, কিংবা সেখান থেকে ইন্টার মায়ামি— ছেলের ক্যারিয়ারের প্রতিটি মোড়ে তিনি ছিলেন নিবিড়ভাবে যুক্ত।
তবে হোর্হের প্রভাব কেবল পেশাদার সম্পর্কের গণ্ডিতে আটকে ছিল না।
২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘বাবা আমাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছেন। তবে আমার খেলার ব্যাপারে তিনি বেশ কড়া সমালোচক। আর ঠিক এ কারণেই আমি সব সময় নিজের সীমানা টপকে আরও ভালো করার তাগিদ পেয়েছি।’
বাবা ও ছেলের সম্পর্কটাকে এর চেয়ে সুন্দরভাবে আর ব্যাখ্যা করা যায় না। স্বপ্ন যখন নাগালের বাইরে মনে হতো, হোর্হে ছিলেন সান্ত্বনা দেওয়া বাবা। আর পুরো বিশ্ব যখন মেসিকে জাদুকর বানিয়ে দিয়েছে, তখনও তিনি ছিলেন সেই সমালোচক— যিনি ছেলেকে থমকে যেতে দেননি।
হোর্হে তারপরও নিজেকে আড়ালেই রেখেছিলেন। খুব কমই সাক্ষাৎকার দিতেন তিনি, সাধারণত ছেলেকে সব মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে দিতেন। তবে এজেন্ট হিসেবে তার নাম জড়িয়েছিল কিছু বিতর্কেও।
২০১৩ সালে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ হোর্হে ও মেসির বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনে। ২০১৭ সালে কয়েক মিলিয়ন ইউরো জরিমানার বিনিময়ে সে মামলার নিষ্পত্তি ঘটে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে স্পেনে হোর্হে, লিওনেল ও লিও মেসি ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ওঠা আরও কিছু অভিযোগ (কর ফাঁকি, জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিং) ২০২১ সালে খারিজ হয়ে যায়।
দাপ্তরিক নথিতে এগুলো থেকে যাবে ঠিকই, তবে এসব ঘটনা হোর্হের জীবনের মূল গল্প হয়ে ওঠেনি কখনোই, তা শুরু হয়েছিল রোজারিওর সেই দিনগুলোতে।
নিজের হাতে গড়ে তোলা ছেলেটিকে তিনি বার্সেলোনার সর্বকালের সেরা ও তর্কসাপেক্ষে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হতে দেখেছেন, দেখেছেন রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর হাতে তোলার ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ার দৃশ্য। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ছেলের বছরের পর বছরের যন্ত্রণা আর ব্যর্থতার ট্র্যাজেডিও তিনি সয়েছেন পাশে থেকে।
অবশেষে হোর্হে সেই মুহূর্তটিও দেখেছিলেন, যা এই দীর্ঘ যাত্রাকে পূর্ণতা দিয়েছিল। ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে তার ছেলে মেসি পরম আরাধ্য বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরে। বার্সেলোনায় একটি ঘরে যে ভীত কিশোর একদিন একা একা কেঁদেছিল, সে-ই তখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব, সমালোচনা, জয় কিংবা ব্যর্থতা— জীবনের প্রতিটি বাঁকেই মেসির পাশে বাবা হিসেবে ছিলেন হোর্হে।
২০১৩ সালে হোর্হে বলেছিলেন, ‘যেদিন লিও খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন আমার মনে হয়— আমি স্বপ্ন ভেঙে জেগে উঠব এবং ফুটবল আর দেখব না।’
রোজারিওর এক কিশোর আর তাকে অনুসরণ করে অজানার পথে পাড়ি দেওয়া এক বাবাকে ঘিরে এই স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল। এর অনেক বছর পেরিয়ে পুরো বিশ্ব দেখেছে কীভাবে সেই কিশোরটি ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কিন্তু এই গোল, ট্রফি আর রেকর্ডের পেছনে ছিল এমন এক নিবিড় সম্পর্ক, যার শুরুটা হয়েছিল খ্যাতি পাওয়ার অনেক অনেক আগে।
আর হয়তো এ কারণেই বিশ্বকাপের মাঠে মেসির কান্নার দৃশ্যটি এতটা অর্থবহ মনে হয়েছিল। পুরো বিশ্ব লিওনেল মেসির মাঝে যা-ই দেখুক না কেন, হোর্হে সব সময় তার নিজের সন্তানকেই দেখে এসেছেন।
আর কোটি কোটি মানুষ লিওনেল মেসির সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখার অনেক আগেই, হোর্হে মেসি বিশ্বাস রেখেছিলেন তার ছেলের ওপর।

