হুমকি থেকে কেন যুদ্ধবিরতির পথে গেলেন ট্রাম্প

ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকির কয়েক ঘণ্টার মাথায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্পের এমন ইউটার্ন নেওয়ার নেপথ্যে আসলে কি ছিল বা কারা ছিল এবং কেন পিছু হটলেন ট্রাম্প—এমন সব প্রশ্নের উত্তর উঠে এসেছে বার্তাসংস্থা এপির বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।    

মঙ্গলবার রাতে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার সঙ্গে এর যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি।

 

তিনি লিখেছেন, ‘এটি হবে একটি দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি। এর কারণ, আমরা ইতোমধ্যে সমস্ত সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছি এবং ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।’

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সম্ভবত একটি কঠিন সত্য উপলব্ধি করেছেন—ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া মানেই আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ আটকা পড়া, যা থেকে তিনি সবসময় যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন।

পূর্বসুরিদের এ ধরনের যুদ্ধের কথা ট্রাম্প ইতোমধ্যে অনেকবার উল্লেখ করে কঠোর সমালোচনাও করেছেন।

ট্রাম্পের এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে তার আলটিমেটাম দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান এবং একইসঙ্গে ইরানকেও দুই সপ্তাহের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান। পর্দার আড়ালে থেকে চীনও এই যুদ্ধবিরতির জন্য কলকাঠি নেড়েছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা।

 

এ বিষয়ে অবগত ওই দুই কর্মকর্তা এপিকে বলেন, ‘ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিযোগী চীন যুদ্ধবিরতির একটি পথ খুঁজে বের করার জন্য নীরবে কলকাঠি নাড়ছিল।’

এছাড়া মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের তীব্র নিন্দা এবং পোপ লিও চতুর্দশের সতর্কবার্তাও যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে উল্লেখ করেছে এপি।

ডেমোক্র্যাটরা, ট্রাম্পের হুমকিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দেন। অন্যদিকে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন উল্লেখ করে ট্রাম্পের মন্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য বলেন পোপ লিও।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলেও সেটি ধরে রাখা হতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী একটি ঝুঁকি।

যুদ্ধ-সংঘাত সংক্রান্ত মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘ব্যাটল রিসার্চ গ্রুপের’ নির্বাহী পরিচালক ও মেরিনের অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা বেন কোনাবল এপিকে বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আটকাতে হলে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার ভূখণ্ড দখল করে রাখতে হতো যুক্তরাষ্ট্রকে। আর এর জন্য অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন সেনার প্রয়োজন পড়ত।’

 

বেন কোনাবলের মতে, এ যুদ্ধ আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো ২০ বছরের একটি অনির্দিষ্টকালীন মিশনে পরিণত হতে পারত।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভাবিনি যে ২০ বছর আফগানিস্তানে থাকব। আমরা ভাবিনি যে, ভিয়েতনামে এত দীর্ঘ সময় থাকতে হবে বা ইরাকে। সুতরাং ভাবুন এবং ২০ বছর ধরে এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’

ট্রাম্পের ধারণা ছিল, বোমা হামলা চালিয়ে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবেন তিনি। কিন্তু ছয় সপ্তাহ পার হওয়ার পরও যখন ইরান তার অবস্থানে অটল, তখন তার ধারণা যে ‘ভুল’ সেটা কিছুটা উপলদ্ধি করতে পেরেছেন ট্রাম্প।

 

আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়া স্বত্বেও ১৯৭৯ সালে ৪৪৪ দিন মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করে রাখা, বছরের পর বছর ধরে ধ্বংসাত্মক ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলতে দেওয়া, ৭ অক্টোবর হামলার পরও হামাসের পাশে থাকা—এমন দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ানোর দৃষ্টান্ত রয়েছে ইরানের।

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরানের নেতৃত্ব একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ বেছে নিতে পারে—এমন সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেছিলেন ট্রাম্প।

 

ছয় সপ্তাহের সংঘাতে ইরানের নেতৃত্বের বড় অংশ বিধ্বস্ত ও অস্ত্র দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তারা শক্তিশালী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারবে— এমন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছিল তেহরান।

এমনকি নিজেদের স্বার্থবিরোধী হলেও ইরান টিকে থাকার লড়াইয়ে এতোটা অনড় থাকবে—এমন ধারণা ট্রাম্পের ছিল না।  

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের একটি পরিচিত কৌশল হলো—তিনি প্রথমে আকাশচুম্বী চাহিদা বা চরম হুমকি দেবেন এবং পরে আলোচনার টেবিলে কিছুটা নমনীয় হন।

এর আগে গ্রিনল্যান্ড দখল বা ইউরোপের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তন করেছিলেন ট্রাম্প।

 

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘দুই সপ্তাহ’ ট্রাম্পের প্রিয় সময়সীমা হয়ে উঠেছে।

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক বোমা হামলা চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছিলেন ট্রাম্প।

রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার আলোচনার সময় এবং এমনকি প্রথম মেয়াদের সময় থেকেও ট্রাম্প বারবার দুই সপ্তাহের সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন, যা শেষ পর্যন্ত খুব সামান্যই ফলপ্রসূ হয়েছে।

Related Articles

Latest Posts