হাজারো তাইওয়ানিজ কেন সাইকেলে দ্বীপটি ঘোরেন

প্রতি বছর তাইওয়ানের হাজারো মানুষ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা হিসেবে সাইকেলে পুরো দ্বীপটি ঘুরে আসেন। এখন এই কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পর্যটকের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যাত্রায় তাইওয়ানের এমন সব দিক দেখা যায়, যা খুব কম বিদেশি পর্যটকই দেখেন।

সম্প্রতি তাইপেইয়ের সাইক্লিস্ট ইথান তাইওয়ানের দুর্গম পূর্ব উপকূলে পাহাড়ের খাড়া ঢাল ঘেঁষে তৈরি নির্জন এক সড়ক ধরে সাইকেল চালাচ্ছিলেন। ঘন সবুজ বন পেরিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পৌঁছান সিবোর্ড মাউন্টেন রেঞ্জের চূড়ায়। সামনে তখন দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত শান্ত সমুদ্র।

ইথান হাসতে হাসতে বিবিসিকে বলেন, ‘কেউ কেউ বলে, জীবনে অন্তত একবার হুয়ানদাও না করলে আপনি আসলে তাইওয়ানিজই নন।’

‘হুয়ানদাও’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘দ্বীপ ঘুরে আসা’। তাইওয়ানের অনেক মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত প্রিয় এক যাত্রা। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তাইপেই থেকে ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটারের পথ ধরে সাইকেলে ঘুরে আসেন পুরো দ্বীপ।

পথে তারা পেরিয়ে যান উত্তরের উপকূলের পাথুরে পাহাড় ও দুর্গম জেলেপল্লি। এরপর জনবসতি কম থাকা পূর্ব উপকূল ধরে দক্ষিণে নামেন। দক্ষিণ প্রান্তের সাদা বালুর সৈকত পেরিয়ে পশ্চিম উপকূলের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্য দিয়ে সাইকেল চালান।

গাড়ি বা মোটরসাইকেলেও হুয়ানদাও করা যায়। তবে স্কুলজীবনে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে অনেক তাইওয়ানিজের কাছে সাইকেলে দ্বীপ ঘুরে আসাটা যেন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ইথান জানান, তিনি চার-পাঁচবার হুয়ানদাও করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবারই আমি একটু ভিন্ন পথে যাই, কখনো বড়, কখনো ছোট বৃত্তে। তাইওয়ান এত সুন্দর যে প্রতিবারই নতুন কিছু দেখার থাকে।’

বিবিসি জানায়, তাইওয়ানে দীর্ঘপথে সাইকেল চালানোর জনপ্রিয়তা ৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো। দ্বীপটি বিশ্বের অন্যতম সেরা সাইক্লিং গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত।

তবে ২০০৬ সালের ‘আইল্যান্ড এত্যুদ’ চলচ্চিত্র মুক্তির পর সাইকেলে পুরো তাইওয়ান ঘুরে আসার ধারণাটি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে সাত দিনে সাইকেলে পুরো দ্বীপ ঘুরতে দেখা যায়।

ছবিতে ওই শিক্ষার্থী ঘুরে তাইওয়ানের জাপানি ঔপনিবেশিক অতীতের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখেন, প্রাচীন আদিবাসী লোকগান শোনেন এবং গ্রামাঞ্চলের এমন মানুষের সঙ্গে দেখা করেন, যারা সহজেই তাকে থাকার জায়গা বা খাবার দিতে এগিয়ে আসে।

এরপর থেকেই বাস্তব জীবনের শিক্ষার্থীরাও তার পথ অনুসরণ করতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য হলো, নিজেদের দ্বীপের এমন একটি দিক আবিষ্কার করা, যা সাধারণত চোখে পড়ে না।

তাইওয়ানিজদের মধ্যে হুয়ানদাও জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর ২০১৫ সালে তাইওয়ান সরকার এই বৃত্তাকার পথটিকে ‘তাইওয়ান সাইকেল রুট নম্বর ১’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে এক ধরনের ‘জাতীয়’ সাইকেলপথ ও সড়ক নেটওয়ার্কও তৈরি হয়।

বেশির ভাগ সাইক্লিস্ট তাইপেই থেকে যাত্রা শুরু ও শেষ করেন। তবে হুয়ানদাওর সৌন্দর্য হলো, যেকোনো জায়গা থেকেই এটি শুরু করা যায়। চাইলে পুরো পথের শুধু একটি অংশও ঘুরে দেখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘তাইওয়ানে এর আগে দুইবার গিয়েছিলাম। তখন মূলত জনবহুল উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলেই ছিলাম। এবার তাইপেই থেকে তাইতুং পর্যন্ত দ্বীপের নির্জন পূর্ব উপকূল ধরে ৫০০ কিলোমিটার সাইকেল চালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। উদ্দেশ্য ছিল অনন্য এক তাইওয়ানকে দেখা।

রাজধানী ছেড়ে ওভারপাসের নিচ দিয়ে নির্ধারিত সাইকেল লেন ধরে এগোলাম বন্দরনগর কিলুংয়ের দিকে। সেখানে বিখ্যাত রাতের বাজারে থেমে খেলাম স্যুপ ডাম্পলিং ও ব্রেইজড ইল।

তবে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে সমুদ্রতীরের শহর ফুলং থেকে আসল সাইক্লিংয়ের আনন্দ শুরু হয়।

সেখানে ঐতিহাসিক ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ওল্ড কাওলিং টানেলকে সাইকেলপথে রূপান্তর করা হয়েছে। মিটমিটে আলোয় পাথরের তৈরি টানেলটি পেরিয়ে তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের উত্তর প্রান্তে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে পৌঁছে গেছি।’

দ্বীপটির উত্তর ও পশ্চিম অংশ আধুনিক ও বিস্তৃত শহরে পরিপূর্ণ, সেখানে পূর্বাঞ্চল দ্বীপটির আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

মধ্য তাইওয়ানজুড়ে আছে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, আর পূর্বাঞ্চলে সমতল জমিও খুব বেশি নেই। ফলে বিশ শতকে আসা অধিকাংশ চীনা বসতি স্থাপনকারী পশ্চিমের সমতল এলাকায় থেকে গেছেন। এতে বিচ্ছিন্ন পূর্বাঞ্চলে আদিবাসী সংস্কৃতি অনেকটাই সংরক্ষিত হয়েছে।

এই সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বিভাজন আজও স্পষ্ট।

তাইওয়ানের হাই-স্পিড রেল কেন্দ্রীয় পাহাড় ভেদ করতে পারেনি। ফলে এটি শুধু পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোর মধ্যেই পর্যটকদের আনা-নেওয়া করতে পারে। পূর্বাঞ্চলে তাই উন্মুক্ততার এক অন্যরকম অনুভূতি আছে।

সেখানে পাহাড়গুলো আরও বিশাল, পামগাছগুলো আরও উঁচু। সরু তাইওয়ান প্রণালির বদলে এই অঞ্চল বিশাল প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে মুখ করে আছে। তাই এখানকার পানি আরও গভীর এবং গাঢ় নীল।

কাঠের তৈরি টোটেম, জ্যামিতিক নকশার মোজাইক এবং আদিবাসী খাবারের ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেয়, হান চীনা ও জাপানি বসতি স্থাপনকারীরা আসার বহু আগে থেকেই তাইওয়ান আমিস, ট্রুকু ও পুয়ুমা আদিবাসীদের আবাসভূমি ছিল।

দক্ষিণে সাইকেল চালাতে চালাতে ইতিহাস ও পরিচয়ের এই স্তরগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে।

বর্তমানে অধিকাংশ তাইওয়ানিজ বৌদ্ধ, তাওবাদী কিংবা চীনা লোকজ বিশ্বাস অনুসরণ করেন। তবে ১৬০০-এর দশকে ইউরোপীয় মিশনারিদের মাধ্যমে দ্বীপটিতে খ্রিষ্টধর্ম আসে, যা বর্তমানে প্রায় ৫ শতাংশ তাইওয়ানিজ অনুসরণ করেন।

ওল্ড কাওলিং টানেল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে হেপিং গ্রামে একটি গির্জা চোখে পড়ে। বিশাল পাহাড়শ্রেণির সামনে সাদা ক্রস দিয়ে চিহ্নিত গির্জাটি মূলত এলাকার ট্রুকু জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হয়।

কাছেই চীনা কবরস্থানের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার খুরের মতো আকৃতির কবরগুলোর ওপরও ক্রস দেখা যায়।

এ যাত্রায় পারিবারিকভাবে পরিচালিত অতিথিশালায় থাকা সম্ভব। যেমন, পাহাড়ের চূড়ায় একটি ট্রিহাউস, মার্বেল পাথরের গিরিখাতের মুখে একটি কুটির এবং নির্জন সমুদ্রতীরে একটি বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট।

দুলানে ওয়াগালিগং অতিথিশালা পরিচালনা করেন আমিস সম্প্রদায়ের সদস্য সিলোকো আকিলা।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুয়ানদাও জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও দ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে মিশতে খুব কম পর্যটকই সময় দেন।

‘আমাদের আরও মানুষকে এখানে আনতে হবে,’ তিনি বলেন।

দুলানের প্রধান আকর্ষণ কী, জানতে চাইলে আকিলা বলেন, ‘এখানকার মানুষ। তারা বন্ধুসুলভ, আন্তরিক এবং সহযোগিতাপ্রবণ। এখানে মানুষের আচরণে উষ্ণতা আছে।’

এক তরুণ তাইওয়ানিজ অতিথি বলেন, কলেজে থাকতে তিনি দ্বীপটির একটি আদিবাসী ভাষা শেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

রাত শেষে আকিলা ও তার বন্ধুরা গিটারের সঙ্গে আমিসদের মায়াবী লোকগান গাইতে শুরু করলেন। পরিবারের মতো এই আতিথেয়তা দ্বীপের আরও অনেক জায়গায় দেখা গেছে।

হুয়ানদাওর অর্ধেক পথ তাইতুংয়ে শেষ হলেও অনেক সাইক্লিস্ট কেন্টিং হয়ে আবার ফিরে যান তাইপেই।

কেন্টিং তাইওয়ানের সবচেয়ে পুরোনো জাতীয় উদ্যান। এখানে বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরিয়ে আনা বুনো হরিণ চিরসবুজ বনের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। আর সাদা বালুর সৈকত ঘিরে আছে দ্বীপটির একমাত্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জাতীয় উদ্যান।

এখন ৩০ বছর বয়সী ইয়াফান চ্যাং ২০১২ সালে ১৬ বছর বয়সে স্কুলের শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে প্রথম হুয়ানদাও করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রায় ১২ কিলোমিটার শুধু ওপরে উঠতে হয়। তারপর পুরোটা পথ নিচের দিকে নেমে আসা। আপনি ঘাসের মাঠের মধ্যে থাকবেন, আবার সূর্যাস্তের সময় ঝলমলে সমুদ্রও দেখতে পাবেন।’

১২ দিন সাইকেল চালানোর পর, আর মাত্র ১০০ কিলোমিটারেরও কম পথ বাকি থাকতে তাইপেইয়ের বাইরে একটি টাইফুনের কবলে পড়েন চ্যাং। ফলে পুরো হুয়ানদাও শেষ করতে পারেননি তিনি।

কয়েক বছর পর তিনি আবার ভাই ও মামাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেন যাত্রা। কারণ তাদের মনে হয়েছিল, পুরো দ্বীপটি দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

‘এটা খুবই তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি,’ তিনি বলেন।

ক্লান্ত হয়ে পড়লে দ্বীপের বিভিন্ন এলাকার মানুষ তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন।

হংকংয়ের ডোরিস কওক ও তাইওয়ানের জেসি চ্যান জানান, পুরো হুয়ানদাও তারা পায়ে হেঁটেই শেষ করেছেন।

কেন সাইকেল বা গাড়িতে না করে হেঁটে হুয়ানদাও করেছেন, জানতে চাইলে কওক বলেন, ‘তাইওয়ান এতটাই সুন্দর যে এর জন্য সময় নিয়ে ধীরে চলা উচিত।’

Related Articles

Latest Posts