‘আমার স্বপ্ন-পরিশ্রম আর সব মূলধন বানের জলে ভেসে গেছে। সব শেষ, বাঁচার আর কোনো পথ দেখি না’—এ কথা বলার সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি বান্দরবান সদর উপজেলার রত্নপুর গ্রামের কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বান্দরবান সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের গোয়ালাখোলা এলাকার রত্নপুর, জিনিঅং, দুংখি, ডলুঝিড়ি, রোয়াজা পাড়া, পুরাতন ব্রিকফিল্ড ও গোয়ালাখোলা পাড়ার শতাধিক কৃষকের ফসলি জমি, সবজিখেত, মাছের পুকুর ও বিভিন্ন কৃষি খামার তলিয়ে গেছে।
সারা বছরের সঞ্চয় ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন হারিয়ে পথে বসার শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
৬৫ বছর বয়সী কৃষক মিন্টু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এক কানি ধনিয়াপাতার খেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। দুটি পুকুরে প্রায় ৫৫ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়ে ছিলাম। বন্যার পানিতে পুকুর ডুবে সব মাছ ভেসে চলে গেছে। সব মিলিয়ে আমার প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
একই গ্রামের কৃষক শুক্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘আমার আড়াই কানি ধনিয়াপাতার খেত ও প্রায় এক হাজার ফলন্ত পেঁপে গাছ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আমার প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
পুরাতন ব্রিকফিল্ড এলাকার কৃষক মো. ওসমান বলেন, ‘এক কানি করলা ও দেড় কানি শসার চাষ করতে এক লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছিল। খেত নষ্ট না হলে অন্তত আড়াই লাখ টাকার সবজি বিক্রি করতে পারতাম। কিন্তু বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে।’
রত্নপুর পাড়ার কৃষক নীল কান্তি তনচঙ্গ্যা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মাছভর্তি দুটি পুকুর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পুকুরে থাকা কাতলা, রুই, মৃগেল ও ব্রিগেড মাছের প্রতিটির ওজন দুই থেকে তিন কেজি হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ বন্যার পানিতে বাঁধ ভেঙে সব মাছ ভেসে চলে যায়।
‘ধার-দেনা করে প্রায় ২ লাখ টাকার মাছের পোনা পুকুরে ছেড়েছিলাম। আর ধনিয়া পাতা চাষ করেছি ৭০ হাজার টাকা খরচ করে। বানের জ্বলে সব তলিয়ে গেছে’, বলেন তিনি।
নীল কান্তি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকব, কীভাবে সংসার চালাব—কোনো উপায় দেখছি না। এখন পথে বসা ছাড়া আর কী করার আছে? সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’
স্থানীয়রা জানান, গোয়ালাখোলা এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে। সবজি, ধান, পানের বরজ, পেঁপে বাগান ও মাছের পুকুর মিলিয়ে শতাধিক কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফলে ফসল হারিয়ে তারা এখন ঋণ পরিশোধ নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
জানতে চাইলে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে। পরে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
এদিকে, আজ সকাল থেকে বান্দরবানে বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। এতে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এখনো কোমর থেকে গলা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে আছে। ফলে চার দিন ধরে পানিবন্দি হাজারো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ সনাতন কুমার মণ্ডল বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় শনিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত জেলায় ১১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির তীব্রতা কমায় পানি নামতে শুরু করেছে। তবে উজান থেকে নতুন ঢল বা আবার ভারী বর্ষণ হলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।
আজ সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিলাশপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া, লেমুঝিরি, রেইচা ও গোয়ালিয়াখোলাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে। কোথাও কোমর, কোথাও আবার গলা সমান পানি জমে রয়েছে। ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মমতা আফরিন বলেন, বন্যায় বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরাও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সেখানে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি অন্যান্য এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

