সৌদি থেকে ছুটিতে এসে ডাকাতি, ৬ বছরে কোটিপতি জলিল

ভাগ্য বদলের আশায় ২০১৬ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন মোহাম্মদ জলিল মোল্যা। চার বছর পর ছুটিতে দেশে ফেরেন। এরপর আর বিদেশে যাওয়া না হলেও দেশেই ভাগ্য বদলাতে থাকে তার।

বরিশালে দোতলা বাড়ি, প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি ও মাছের খামার করেছেন। সাভারে রয়েছে পাঁচতলা বাড়ি। কয়েক বছরের ব্যবধানে গড়ে তোলেন কোটি টাকার সম্পদ।

পুলিশের দাবি, জলিলের এসব সম্পদের বড় একটি অংশ এসেছে ডাকাতির টাকা থেকে।

সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় ‘ডিএল ফিলিং স্টেশনের’ ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জলিল গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার এসব সম্পদের বিষয় সামনে আসে।

গত ৯ আগস্ট সকালে বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার সামনে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় ডিএল ফিলিং স্টেশনের এক কর্মীকে কুপিয়ে ওই টাকা ছিনিয়ে নেয় মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র একটি দল।

এ ঘটনায় করা মামলায় জলিলকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। র‍্যাব জানায়, ডাকাতির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা ছিল জলিলের। তার কাছ থেকে লুটের অর্থ থেকে ৪৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জলিলকে আদালতে নেওয়া হলে তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। 
মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা জানান, জলিলের বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অন্তত ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জলিলের সাভারে পাঁচতলা বাড়ি আছে। এছাড়া গরুর খামার ও পুকুরও রয়েছে। ডাকাতির মাধ্যমে এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।’

‘এসব সম্পদের তথ্য সবাই জানে। তবে আমরা ধারণা করছি, এর বাইরেও তার সম্পদ রয়েছে। আমরা ফের রিমান্ড চাইব,’ বলেন তিনি।

শুরু সৌদি থেকে ছুটিতে এসে

পুলিশের নথি অনুযায়ী, বরিশাল সদর উপজেলার খানপুরা গ্রামের মৃত আলী মোল্যা ও সোনাবড়ু দম্পতির ৮ ছেলের মধ্যে সবার ছোট জলিল। পড়াশোনা করেছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০০১ সালে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যান জলিল। কয়েক বছর ট্যাক্সি চালানোর পর একটি এনজিওতে চালক হিসেবে কাজ করেন।

গাড়ি চালানোর সময় মাহতাব নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন জলিল। মাহতাবের বাড়ি পটুয়াখালী।

এরপর ২০১৬ সালে সৌদি আরবে যান জলিল। এরপর ২০১৯ সালের মাঝামাঝি ছুটিতে দেশে ফেরেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরার পর মাহতাব ডাকাতির প্রস্তাব দিলে জলিল রাজি হন।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এরপর কালিয়াকৈরের একটি গার্মেন্টসের বেতনের প্রায় ৮৪ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান জলিল।

জেল থেকে বের হওয়ার পর টাঙ্গাইল, মিরপুর ও মতিঝিলের কয়েকটি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত থাকার কথা তিনি জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন বলে জানান তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মিরপুরে স্বর্ণ ডাকাতির একটি মামলায়ও জলিল গ্রেপ্তার হন। পরে কারাগার থেকে বেরিয়ে মতিঝিলে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার তথ্যও পাওয়া গেছে।

তবে এসব ঘটনার বাইরে জলিলের অপরাধের পরিধি কতটা বিস্তৃত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।

সম্পদের হিসাব মেলেনি

তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন জলিলের সম্পদের উৎস নিয়ে। জিজ্ঞাসাবাদে যেসব ডাকাতির কথা তিনি বলেছেন, সেসব ঘটনায় অর্থ উদ্ধারের তথ্য রয়েছে। কিন্তু ওই অর্থের পরিমাণের সঙ্গে তার বর্তমান সম্পদের হিসাব মিলছে না বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তাদের।

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেসব ঘটনার কথা তিনি স্বীকার করেছেন, প্রায় সব কয়টিতেই টাকা উদ্ধারের তথ্য আছে। কিন্তু সাভারের পাঁচতলা বাড়ি, বরিশালের বাড়ি ও খামার করার টাকার বিষয়ে তিনি এখনো কোনো তথ্য দেননি।’

তবে, জলিল তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে সম্পদের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অল্প অল্প করে টাকা বিনিয়োগ করে খামারটি বড় করেছেন। আর সৌদি আরবে থাকতেই সাভারের জায়গা কিনেছিলেন। পরে দেশে ফিরে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

এক অতিরিক্ত উপকমিশনার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাড়ি নির্মাণের টাকার উৎস জিজ্ঞাসা করলে জলিল কোনো উত্তর দিতে পারেননি।’

পাঁচ একরের খামার

বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের উত্তর চর আইচা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জলিলের কৃষি খামার। স্থানীয়রা এটিকে ‘মোল্লা ফার্ম’ নামে চেনেন।

খামারে রয়েছে পাঁচটি পুকুর। সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়। রয়েছে প্রায় ৪০টি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান গরু, ২০টি ছাগল, প্রায় ১০০টি হাঁস এবং প্রায় ১ হাজার মুরগি।

সড়ক থেকে খামারে ঢোকার দুই পাশে রয়েছে পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন ফলদ গাছ। আছে সাথী ফসলও। এত বড় খামার দেখাশোনা করেন মাত্র দুজন শ্রমিক।

দুই শ্রমিক জানান, তারা প্রায় ৮ মাস ধরে সেখানে কাজ করছেন। প্রত্যেকে মাসে ২০ হাজার টাকা বেতন পান।

তাদের ভাষ্য, গত ১৩ আগস্ট জলিল সবশেষ খামারে এসেছিলেন। পরদিন তার খোঁজে ডিবির সদস্যরা সেখানে যান। এরপর আর তাকে দেখা যায়নি।

জলিলের ভাই দলিল মোল্যা বলেন, প্রায় ১০-১২ বছর আগে খামারটি গড়ে তোলা হয়। এজন্য স্থানীয় আকবর হোসেনের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ একর জমি ইজারা নেওয়া হয়।

তবে, জলিলের সম্পদের উৎস নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলতে চাননি। একপর্যায়ে এ বিষয়ে সংবাদ না করার জন্য অনুরোধ করেন।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে জলিল জানিয়েছেন যে তিনি ২০১৮ সালে খামারের কাজ শুরু করেন।

পুরোনো ঘরের পাশেই নতুন বাড়ি

জলিলের স্থায়ী ঠিকানা বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার খানপুরা এলাকায়। সেখানে গিয়ে তার দোতলা একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। বাড়িটির পাশেই রয়েছে পরিবারের পুরোনো টিনের ঘর—যেখানে একসময় তাদের পরিবারের বসবাস ছিল।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা জলিলের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। এমনকি তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কোনো ফোন নম্বরও দিতে চাননি।

ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক লিয়াকত আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ডাকাতির প্রায় ৬০ লাখ টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি। আমাদের প্রথম লক্ষ্য টাকা উদ্ধারের দিকে। তবে পাশাপাশি তার যে দৃশ্যমান সম্পদ রয়েছে, তার বাইরে কোনো সম্পত্তি আছে কি না সেগুলো তদন্ত করছি।’

Related Articles

Latest Posts