সৌদি আরবও গোপনে হামলা চালিয়েছিল ইরানে

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে নতুন তথ্য দিল রয়টার্স। প্রথমবারের মতো সৌদি আরব সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে গোপন সামরিক হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে বার্তাসংস্থাটি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমান বাহিনী ইরানের ভেতরে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে লক্ষ্যবস্তুগুলো শনাক্ত করতে পারেনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ও দুজন ইরানি কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের ভেতরে সামরিক হামলা চালিয়েছে বলে সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে।

একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা ইরানে সৌদি আরবের এই হামলাকে ‘ইটের বদলে পাটকেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, সৌদি আরবে ইরানি হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সরাসরি হামলার কথা স্বীকার না করলেও রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সৌদি আরব সবসময় উত্তেজনা কমানো, সংযম প্রদর্শন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পক্ষপাতী। অন্যদিকে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। 

লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও তেল অবকাঠামো। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে তেহরান।

সৌদি আরব ও আমিরাতের এই পাল্টা পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়েছে, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো এখন আর শুধু প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই, প্রয়োজনে তারা সরাসরি জবাব দিতেও প্রস্তুত।

তবে দুই দেশের অবস্থানে পার্থক্যও রয়েছে। আমিরাত তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিলেও সৌদি আরব একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রেখেছে। রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পশ্চিমা ও ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, হামলার পর সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে বিষয়টি জানায়। এরপর শুরু হয় নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ। রিয়াদ আরও কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিলে শেষ পর্যন্ত দুই দেশ উত্তেজনা প্রশমনে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় পৌঁছায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায় যে উভয় পক্ষই বুঝতে পেরেছে, নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। তার মতে, এটি আস্থার সম্পর্ক নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর একটি বাস্তববাদী সমঝোতা।

এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা কার্যকর হয় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার ঠিক আগের সপ্তাহে।

দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও সৌদি আরব, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতে বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়। সেই সমঝোতার অংশ হিসেবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের যুদ্ধবিরতিও এখন পর্যন্ত বহাল রয়েছে।

গত ১৯ মার্চ রিয়াদে এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেছিলেন, ‘প্রয়োজন মনে করলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে।’ এর তিন দিন পর ইরানের সামরিক অ্যাটাশেসহ চার কূটনীতিককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সৌদি আরব। 

রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে সৌদি আরবের ওপর ১০৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল। কিন্তু সমঝোতার পর ১ থেকে ৬ এপ্রিলের মধ্যে তা কমে দাঁড়ায় ২৫টির কিছু বেশি হামলায়।

পশ্চিমা সূত্রগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির ঠিক আগে সৌদি আরবে ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরাসরি ইরান থেকে নয়, বরং ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ছোড়া হয়েছিল। এটি তেহরানের ‘সংযত’ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সৌদি আরবের ওপর নতুন করে ৩১টি ড্রোন ও ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা রিয়াদকে আবারও পাল্টা হামলার কথা ভাবতে বাধ্য করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তান সৌদি আরবের আকাশসীমায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে এবং উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

 

 

Related Articles

Latest Posts