সুদমুক্ত ঋণের নীতিতেই চালাতে হবে ইসলামি ক্রেডিট কার্ড

ইসলামি ক্রেডিট কার্ড নিয়ে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকের বকেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়লে কিংবা বিল পরিশোধে দেরি হলে ব্যাংকগুলো আর অতিরিক্ত মুনাফা নিতে পারবে না।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক এমন নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, ইসলামি ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ইসলামি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করতে পারবে। 

তবে বৈদেশিক মুদ্রা বা দ্বৈত মুদ্রার কার্ড দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটিকে অনুমোদিত ডিলার বা বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রয়োজনীয় লাইসেন্সধারী হতে হবে।

এই নীতিমালার অধীনে ইসলামি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা, নগদ টাকা উত্তোলন কিংবা নির্ধারিত সময়ের পরে বিল পরিশোধের বিষয়গুলোকে ‘কর্জ হাসান’ বা সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ঋণের জন্য ব্যাংক কোনো সুদ বা অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারবে না।

তবে নির্দিষ্ট সেবার বিপরীতে ব্যাংক একটি নির্ধারিত সেবামূল্য বা ‘উজরাহ’ আদায় করতে পারবে। 

এছাড়া এই কার্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ‘মুদারাবা’ বা বিনিয়োগকারী গ্রাহকদের সঞ্চিত আমানতের তহবিল ব্যবহার করতে পারবে না।

মুদারাবা হলো এমন এক ধরনের বিনিয়োগ আমানত, যেখানে গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রাখেন এবং সেই টাকা থেকে হওয়া মুনাফার একটি অংশ পায়।

কার্ড দেওয়া, নবায়ন, হিসাব পরিচালনা বা নগদ টাকা তোলার মতো সেবার জন্য ব্যাংক যে ফি নেবে, তা সেবাটি দিতে ব্যাংকের প্রকৃত পত্যক্ষ খরচের বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ এসব ফি থেকে ব্যাংক কোনো মুনাফা করতে পারবে না। 

গ্রাহকের বকেয়া টাকার পরিমাণ, কার্ডের ঋণসীমা বা বিলম্বের সময়ের জন্য কোনো ফি ধার্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

পাশাপাশি কেনাকাটার সময় দোকানদার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানদের কাছ থেকে পাওয়া কমিশন ব্যাংক নিতে পারবে না। বছর শেষে অতিরিক্ত টাকা গ্রাহককে ফেরত দিতে হবে অথবা দাতব্য কাজে দান করে দিতে হবে।

ধরা যাক, একটি কার্ড চালু ও পরিচালনা করতে ব্যাংকের বছরে ৮০০ টাকা খরচ হয়। তাহলে ব্যাংক সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা ফি নিতে পারবে। কিন্তু ঋণসীমার ২ শতাংশ হারে ফি নিতে পারবে না। কারণ ঋণসীমা বাড়লে ওই ফিও বেড়ে যাবে।

একইভাবে কার্ড থেকে নগদ টাকা তোলার ফিও নির্দিষ্ট অঙ্কের হতে হবে। কত টাকা তোলা হয়েছে, তার ওপর শতাংশ হিসেবে ফি নেওয়া যাবে না।

বিল পরিশোধে বিলম্বের বিষয়ে বলা হয়েছে, কার্ড নেওয়ার সময় গ্রাহক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ‘চ্যারিটি অ্যাকাউন্টে’ বা দাতব্য কাজে দেওয়ার সম্মতি দেবেন। 

নির্ধারিত সময়ে বিল না দিলে কেবল ওই নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকাই জরিমানা হিসেবে আদায় করা যাবে, যা ব্যাংক সরাসরি দাতব্য সংস্থায় দান করে দেবে। এই টাকা ব্যাংক নিজের আয় হিসেবে দেখাতে পারবে না। 

এছাড়া বিলম্বের সময় যত বেশিই হোক না কেন, জরিমানা বা দানের টাকা আর বাড়ানো যাবে না।

যেমন, কেউ যদি নির্ধারিত সময়ের দুদিন পরে বিল দেন, আর অন্য কেউ যদি দুই মাস পরে দেন, দুজনকেই যদি ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা থাকে, তাহলে দুজনকেই ৫০০ টাকা দিতে হবে। দেরি বেশি হওয়ায় দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া যাবে না।

গ্রাহক সুরক্ষায় বেশ কিছু নতুন নিয়মও যুক্ত করা হয়েছে। কার্ড পাওয়ার পর গ্রাহককে পাঁচ কর্মদিবসের একটি ‘কুলিং-অফ পিরিয়ড’ দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে তিনি চাইলে কার্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে পারবেন। 

যেকোনো ফি বা শর্তে পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে ব্যাংককে অন্তত ৩০ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে। 

তাছাড়া কার্ড জালিয়াতি বা চুরি হওয়ার খবর ব্যাংককে জানানোর পর যদি কোনো অননুমোদিত লেনদেন হয়, তার সম্পূর্ণ দায় ব্যাংক বহন করবে এবং সাত কর্মদিবসের মধ্যে গ্রাহককে টাকা ফেরত দেবে। একবারে নগদ টাকা তোলার সুযোগ থাকবে কার্ডের মোট ঋণসীমার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।

ইসলামি শরিয়াহ মতে নিষিদ্ধ, এমন কোনো পণ্য বা সেবা, যেমন মদ, জুয়া, তামাক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে এই কার্ড ব্যবহার করা যাবে না।

ব্যাংকগুলোকে ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ ব্যবহার করে কেনাকাটার পয়েন্টে এসব লেনদেন প্রযুক্তিগতভাবে ব্লক করে রাখতে হবে।

প্রতি অর্থবছর শেষে দুই মাসের মধ্যে শরিয়াহ অডিট রিপোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। নিরীক্ষায় অননুমোদিত কোনো আয় পাওয়া গেলে তা চ্যারিটি বা দাতব্য কাজে দিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজনে পরে এসব নিয়ম পরিবর্তন করা হতে পারে। এ বিষয়ে আরও ব্যাখ্যাও দেওয়া হতে পারে।

Related Articles

Latest Posts