দেশের দরিদ্র, নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের বরাদ্দ বাড়াচ্ছে সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য আগামী অর্থবছরে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
তবে বরাদ্দ বাড়লেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা কিছুটা কমানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আওতায় কয়েকটি নতুন কর্মসূচিও যুক্ত হচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নতুন মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের এই বরাদ্দ দেশের মোট জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং প্রস্তাবিত মোট বাজেটের প্রায় ১৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা বর্তমানের ৯৫টি থেকে কমিয়ে ৯০টিতে আনা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৫টি কর্মসূচিকে সরাসরি ‘দরিদ্রবান্ধব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বরাদ্দ থাকছে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি অর্থবছরে এ ধরনের ৩৮টি কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ছয়টি নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নতুন উপকারভোগীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় এক কোটি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে ৪১ লাখ পরিবার নির্বাচন করা হবে। নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এ জন্য আগামী বাজেটে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
তবে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগীরা অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না। একই ব্যক্তি যেন একাধিক কর্মসূচির সুবিধা নিতে না পারেন, সেজন্য উপকারভোগীদের নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্যসংবলিত একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরি করা হবে।
এছাড়া বিএনপির আরেকটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি ‘ফার্মার্স কার্ড’-এর আওতায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এ খাতে বরাদ্দ থাকছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ১৫ হাজার ৬৬৯ জনকে আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে প্রতি মাসে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনে নিহত ৮৪৪ জনের পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেওয়া হবে।
সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদারে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী ও উৎসব ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত, ভিক্ষু এবং মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের তত্ত্বাবধায়ক মিলিয়ে মোট ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৬৬ জন এ সুবিধা পাবেন।
এর মধ্যে ইমামরা মাসে ৫ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনরা ৩ হাজার টাকা এবং খাদেমরা ২ হাজার টাকা করে পাবেন। অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভাতা দেওয়া হবে।
ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নতুন একটি উদ্যোগে ১৫ লাখ দরিদ্র কর্মজীবী মানুষকে ১ লাখ ১০ হাজার টন চালের সমপরিমাণ নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া নতুন আরেকটি কর্মসূচির আওতায় ১৫ হাজার বেকার শ্রমিককে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। এ খাতে ব্যয় হবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর মধ্যে বয়স্ক ও বিধবা ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ করে বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ভাতার পরিমাণ মাসে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে ৬১ লাখ মানুষ বয়স্ক ভাতা এবং ২৯ লাখ মানুষ বিধবা ভাতা পান।
প্রতিবন্ধী ভাতা ১০০ টাকা বাড়িয়ে মাসে ১ হাজার টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যা আরও আড়াই লাখ বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তিও ১ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা করা হচ্ছে।
মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখের বেশি বাড়ানো হলেও ভাতার পরিমাণ আগের মতোই মাসে ৮৫০ টাকা থাকছে।
ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা সহায়তায় বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭০০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একজন রোগীর জন্য সর্বোচ্চ আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হতে পারে।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ ভাতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকছে। তবে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক—এই চার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা করে বাড়ানো হবে। বর্তমানে এ চার শ্রেণিতে ৫৮৯ জন ভাতা পাচ্ছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ও কৌশল তুলে ধরে একটি পৃথক বাজেট দলিলও প্রকাশ করা হবে।

