সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমিয়ে বিধিমালা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের মান আরও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। তবে গতকাল পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত গেজেট আকারে প্রকাশ হয়নি।
বর্তমানে ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ হয় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে। আর ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগ হয় মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়োগ বিধিতে।
পিএসসির নিয়োগ নিয়ে তুলনামূলক কম প্রশ্ন উঠলেও মন্ত্রণালয় ও অধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনের নিয়োগ নিয়ে অনেক সময়ই দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। এখন ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি আরও সহজ হবে বলে মনে করেন জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভায় ১০ নম্বরের স্থলে তিন ভাগে ২৫, ৪০ ও ৫০ নম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি।
আর এসব গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর অন্তত ৫০ শতাংশ, যা প্রস্তাবিত নিয়োগ বিধিমালায় কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রশাসনিকভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ১৩ সদস্যের সচিব কমিটি সর্বোচ্চ কমিটি।
সচিব কমিটিতে অনুমোদন পাওয়া বিধিমালা ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের তিনটি ভাগে লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে ১১ ও ১২ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভায় ১০ নম্বরের পরিবর্তে ৫০ নম্বর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিদ্যমান নম্বরের চেয়ে ৪০০ শতাংশ বেশি।
একই গ্রেডের লিখিত পরীক্ষায় ৯০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই গ্রেডে বিদ্যমান লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করতে হয়, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিদ্যমান বিধিমালায় ১৩ থেকে ১৬ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার নম্বর যথাক্রমে ১০ ও ৯০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় এসব গ্রেডের ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তাব করা হয়েছে যথাক্রমে ৪০ ও ৬০। এসব গ্রেডের বিদ্যমান লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০ শতাংশ হলেও প্রস্তাবিত বিধিমালায় কমিয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।
বিদ্যমান বিধিমালায় ১৭ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার নম্বর ১০ ও ৪০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় এই চারটি গ্রেডে ভাইভা ও লিখিত পরীক্ষার জন্য যথাক্রমে ২৫ ও ২৫ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এমন উদ্যোগ চূড়ান্ত রূপ পেলে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসনবিষয়ক গবেষক আব্দুল আওয়াল মজুমদার।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘উচ্চ গ্রেড বা নিম্ন গ্রেডে যে পদেই হোক, ভাইভায় ১০ নম্বরই যথেষ্ট, সর্বোচ্চ ২০ পর্যন্ত হতে পারে। দপ্তর-সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে অনেক সমস্যা হয়, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগ জটিলতা আরও বেড়ে যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সুশাসন পরিপন্থী।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের পদ আছে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের ৬৫ শতাংশ নিয়োগ প্রভাবিত হবে।
শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, আনসার বাহিনী ও সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিধিমালা প্রযোজ্য হবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিব কমিটিতে উপস্থাপিত যুক্তিতে বলেছে, এসব পদে দেওয়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে চাকরি লাভের চেষ্টা করার কারণে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি লাভের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
‘এ পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের বাছাই করার লক্ষ্যে সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাসমূহের ১১-২০তম (পূর্বতন ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণি) গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য বিদ্যমান পরীক্ষার নম্বর বণ্টন সংশোধন করা প্রয়োজন’ বলে যুক্তিতে তুলে ধরেছে মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী গতকাল রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকার মেরিটোক্রেসি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে, এই উদ্যোগ তারই অংশ।’

