বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক চর্চার সংকট শুধু শিল্প-সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমাজ কীভাবে নিজের ইতিহাস, পরিচয় এবং সংস্কৃতি ও ধর্মের সম্পর্ককে বোঝে সেই গভীর সংকটও।
দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে শনিবার আয়োজিত ‘ইতিহাস আড্ডা’র ২৭তম পর্বে বক্তারা এ কথা বলেন।
তারা বলেন, সংস্কৃতিকে শুধু গান, নাটক, নৃত্য বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর ব্যাপক অর্থ বোঝা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সংলাপ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমাজ ও ইতিহাস নিয়ে গভীর আলোচনা।
গবেষক ও শিল্পী অরূপ রাহী বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার জটিলতা বুঝতে ব্যর্থতার কারণে সাংস্কৃতিক বিতর্কও অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে।
‘আমাদের বোঝার সংকট আছে, জ্ঞানের সংকট আছে। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার জটিলতা আমরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি,’ বলেন তিনি।
অরূপ রাহী বলেন, ইতিহাস ও সমাজের পরিবর্তনকে গভীরভাবে বোঝার পরিবর্তে জটিল বিষয়গুলোকে সহজ কিছু ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়।
‘বাম, ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী কিংবা ইসলামপন্থী—যে পক্ষই হই না কেন, এসব বিষয় বোঝার ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গভীর একটি ঔপনিবেশিক কাঠামো বহন করি,’ বলেন তিনি।
তার মতে, বাইরের তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের নিজস্ব উপনিবেশ-পরবর্তী বাস্তবতা, রাষ্ট্রকাঠামো ও পুঁজিব্যবস্থাকে বোঝা প্রয়োজন।
‘আমরা গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি, কিন্তু আমাদের মতো একটি উপনিবেশ-পরবর্তী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কীভাবে কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করি না,’ বলেন অরূপ রাহী।
ইসলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন সমাজ ও সময়ে ইসলামকে ভিন্নভাবে বোঝা ও চর্চা করা হয়েছে। কিন্তু আলোচনায় ইসলামকে প্রায়ই একটি চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় রূপ হিসেবে দেখা হয়।
‘আমরা খুব দ্রুত একটি পক্ষ বেছে নিই—ধর্মনিরপেক্ষ না ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী। ফলে সংস্কৃতি ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে অর্থবহ আলোচনায় পৌঁছাতে পারি না,’ বলেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে অরূপ রাহী বলেন, ‘তৌহিদি জনতা’ ধারণাটির সমাজতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সমাজে এই ধারণাটি কীভাবে তৈরি হলো এবং এর পেছনে কোন শক্তিগুলো কাজ করছে, তা নিয়ে আরও আলোচনা দরকার।
তিনি বলেন, ‘সংস্কৃতি শুধু আমরা গান গাইতে পারছি কি না, নৌকাবাইচ আয়োজন করতে পারছি কি না কিংবা ধর্মীয় সমাবেশ করতে পারছি কি না—তার বিষয় নয়। সংস্কৃতি হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আমরা নিজেদের, আমাদের চেতনা ও ভবিষ্যৎকে বুঝি।’
কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন, সংস্কৃতিকে বুঝতে হলে জনপরিসর, সত্যের অনুসন্ধান এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্র—এই বিষয়গুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।
তার মতে, জনপরিসর ভিন্নমতের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়। সত্যের অনুসন্ধান রাজনীতির বিষয় নয়; এটি দর্শন ও বিজ্ঞানের বিষয়। রাজনৈতিক জীবনে মতভেদ দূর করে দেওয়া নয়, বরং মতভেদের মধ্যেও একসঙ্গে থাকার সক্ষমতা প্রয়োজন।
ফরহাদ মজহার বলেন, অর্থবহ সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য ভাষা ও ইতিহাস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রয়োজন। বাংলা ভাষা, ইসলাম এবং এ অঞ্চলের সামাজিক অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক সম্পর্ক থেকে বাঙালি সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না।
‘সংস্কৃতি সহজ বিষয় নয়। এটি শিল্পের পাশাপাশি রাজনৈতিকও,’ বলেন তিনি।
সমাজকে বোঝার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে ভিন্নমত প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন ফরহাদ মজহার।
শিল্পী ও শিক্ষক লায়েকা বশীর বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। একসময় পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখা গেলেও এখন তা কমে যাচ্ছে।
‘একসময় পাড়া দিয়ে হাঁটার সময় বিভিন্ন বাসা থেকে সংগীতচর্চার শব্দ শোনা যেত। এখন সেই দৃশ্য ও শব্দ প্রায় হারিয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।
লায়েকা বশীর বলেন, গান চর্চা করবেন—এ কথা জানার পর অনেক সময় বাড়ির মালিকেরা শিল্পীদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে অনাগ্রহী হন। তার মতে, সাংস্কৃতিক চর্চার বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ হঠাৎ তৈরি হয়নি; ধীরে ধীরে এর একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
‘সংস্কৃতি’ শব্দটিকে ঘিরে একধরনের ভয় তৈরি করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ‘যেন সংস্কৃতি মানুষকে ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।’
পাঠাভ্যাস ও জ্ঞানচর্চা কমে যাওয়াকেও সাংস্কৃতিক চর্চা দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন লায়েকা বশীর।
‘জ্ঞান, বিজ্ঞান, সংগীত, সাহিত্য ও দর্শনের মধ্য দিয়ে শেখার অভ্যাস দুর্বল হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক চর্চায় বাধা তৈরির ক্ষেত্রে এটি বড় ভূমিকা রেখেছে,’ বলেন তিনি।
আলোচনা শেষে শ্রোতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও প্রতিক্রিয়া পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। উন্মুক্ত এই পর্বে প্রায় ১৫ জন অংশ নেন।

