কয়েকদিন আগেও ছিলেন সেনাপ্রধান। আজ শপথ নিলেন বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে।
আজ শুক্রবার বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বিষয়টি জানা গেছে।
সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাঁচ বছর আগে নোবেলজয়ী অং সান সুচির বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হ্লাইং।
২০২১ সালের ওই ঘটনার প্রতিবাদে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা আজও চলছে।
প্রায় অর্ধ-দশক বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পর জানুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেন হ্লাইং।
তবে এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি সুচির দলসহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। মূলত, সাবেক সেনাসদস্য ও সেনাবাহিনীর মিত্ররাই এই একপেশে নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হন।
আজ শুক্রবার রাজধানী নেপিদোয় দেশটির পার্লামেন্টে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ৬৯ বছর বয়সী মিন হ্লাইং বলিষ্ঠ কণ্ঠে শপথ গ্রহণ করেন।
এ সময় তিনি মিয়ানমারে ‘ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার’ অঙ্গীকার করেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাঁচ বছরের মেয়াদের শুরুতে তিনি বলেন, ‘আমি মিয়ানমারের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করছি’।
এর আগে সেনাপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন হ্লাইং।
সোমবার থেকে মিয়ানমারের নববর্ষের উৎসব থিনগিয়ান শুরু হতে যাচ্ছে।
তবে গণতন্ত্র নিরীক্ষক সংস্থাগুলো এই পুরো প্রক্রিয়াকে নাকচ করেছে। তাদের মতে, প্রহসনমূলক নির্বাচন হয়েছে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামরিক শাসনের কার্যত কোনো পার্থক্য নেই—এ যেন নতুন মোড়কে পুরনো পণ্যের প্রদর্শনী।
শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে নেপিদো শহরকে নিরাপত্তা চাদরে ঢেকে ফেলা হয়।
এএফপির প্রতিবেদকরা নেপিদোর হোটেলগুলোর আশেপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিটকে টহল দিতে দেখেন। শহরজুড়ে বেশ কয়েকটি টহল চৌকিও বসানো হয়েছে।
সামরিক জান্তা এই নির্বাচনকে ‘জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার’ ও ‘গৃহযুদ্ধ’ অবসানের পথ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে।
তবে গতকাল মিন অং হ্লাইং এর মন্ত্রিসভার যে ৩০ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন, তাদের দুই তৃতীয়াংশই সাবেক ও বর্তমান সামরিক কর্মকর্তা।
এর আগে, অভ্যুত্থানের পর গঠিত জান্তা সরকারেও সেনা সদস্যদের আধিক্য দেখা যায়। ইতোমধ্যে ওই সরকারের অনেক সদস্য আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের আওতায় এসেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিয়ানমারের অভ্যুত্থান পরবর্তী নেতৃবৃন্দকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের লক্ষ্য ছিল মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের ‘বৈধতা দেওয়া’ ও বিশ্বজনতার কাছে তাদের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটানো। পরবর্তী লক্ষ্যের মধ্যে আছে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো বা বন্ধ থাকা বিদেশি অর্থায়ন ও প্রকল্পগুলো আবারও চালু করা।
আজকের শপথ অনুষ্ঠানে চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
থাই প্রধানমন্ত্রী এ সপ্তাহে হ্লাইংকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠান। তিনি আশাবাদ করেন, হ্লাইংয়ের যোগ্য নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বলিষ্ঠ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক বেইজিং।
মিয়ানমারে বেইজিং এর বেশ কয়েকটি অবকাঠামোগত প্রকল্পের কাজ এতদিন বন্ধ ছিল। এগুলোকে নতুন করে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের পর মিয়ানমারের ইতিহাসে সামরিক শাসকদের আধিপত্য দেখা গেছে।
২০১১ সালে এক বিরল ঘটনায় সেনাবাহিনীর প্রভাব কমতে শুরু করে। সে সময় প্রায় এক দশক অং সান সুচির বেসামরিক সরকার দেশটিকে পরিচালিত করে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দলগুলোর ভরাডুবিতে উদ্বেগ-আশংকায় পড়ে যান সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। এই ঘটনার জেরে এক বছরের মাথায় অভ্যুত্থানের উদ্যোগ নেন তিনি।
এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন নামের নিরীক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে যে দলগুলো ৯০ শতাংশের বেশি আসন জিতে নেয়, তারা কেউই ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি পায়নি। পাশাপাশি, যারা এ বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়েছেন বা নির্বাচনবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়েছে সামরিক সরকার।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোতে কোনো ভোট হয়নি।
সার্বিকভাবে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের নির্বাচন ও মিন অং হ্লাইং-এর সেনাপ্রধান থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

