লিখিত-ভাইভায় পাস করেও ‘ঠিকানা বিভ্রাটে’ পাননি প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের চিঠি

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক—উভয় পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে আছে, কারণ প্রার্থীর স্থায়ী ঠিকানা যাচাই করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অথচ তার পরিবার ৪ দশকের বেশি সময় ধরে ঝিনাইদহ শহরের একই এলাকায় বসবাস করে আসছে।

ঝিনাইদহ শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা মিশন আচার্য (৩১) ও তার পরিবারের সব সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ওই এলাকার নামই আছে।

তার মা ময়না আচার্য (৬২) এই একই এলাকায় ৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। এখানেই তার বিয়ে ও দুই সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু সেই ঠিকানাতেই ছোট ছেলে মিশনের চাকরির নিয়োগপত্র না আসায় খুব কষ্ট পেয়েছেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারকে ময়না বলেন, ‘ছোট ছেলে গর্ভে থাকা অবস্থায় স্বামী ছেড়ে চলে যায়। মানুষের বাড়িতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচারিকার কাজ করে দুই সন্তানকে বড় করেছি। ছোট ছেলেকে খুব কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছি। কিন্তু নিজের বাড়ি নেই বলে ছেলে সরকারি চাকরির লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় টিকেও বাদ পড়ে গেল। ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগানে ৪৫ বছরের বেশি সময় বসবাস করলেও স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারলাম না।’

তিনি জানান, তারা এই এলাকার ভোটার। মা সুবর্ণা বিশ্বাসকে নিয়ে কলাবাগানের কদু মিয়ার প্রায় ৫০ বছর আগে তৈরি করা একটি সেমি পাকা বাড়িতে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন।

বড় ছেলে শৈলেন আচার্য কলাবাগান চৌরাস্তা মোড়ে পুরোনো কাপড়ের ব্যবসা করে ৭ জনের সংসার চালাচ্ছেন বর্তমানে।

ময়না জানান, তার বাবার বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার কাগজি পাড়া গ্রামে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কয়েক বছর পর তারা পুরো পরিবার ঝিনাইদহ শহরে এসে ভাড়াবাড়িতে বসবাস শুরু করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মিশনকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। ছেলেটা মেধাবী। এর আগে কয়েকটি সরকারি পরীক্ষায় লিখিত ও ভাইভাতে টিকলেও পরে ভেরিকেশনে বাদ পড়ে যায়। এবার সরকারি প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় পাস করেও শুনেছি ভেরিফিকেশনে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিশন আচার্য ঝিনাইদহ কাঞ্চননগর স্কুল থেকে বাণিজ্য বিভাগে ২০১০ সালে এসএসসি, শিশুকুঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিনান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেছেন।

বড় ভাই শৈলেন আচার্য বলেন, ‘প্রাইমারি স্কুলের সব পরীক্ষায় মিশন পাস করার পর পুলিশ ও এনএসআইয়ের লোক বাড়িতে এসেছিল। তাদের সব তথ্য দিয়েছি, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে দেখি আমার ভাইয়ের রোল নম্বর নেই।’

মিশন আচার্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার আবেদন ফর্মে আমার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে কলাবাগানের ঠিকানা দেওয়া আছে। আমার নামে পাঠানো সব চিঠিপত্র আমি এই ঠিকানাতেই পাই। কিন্তু এই নিয়োগ থেকে আমাকে কেন বাদ দেওয়া হলো বুঝতে পারছি না।’

যোগাযোগ করা হলে ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমজাদ হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ছেলেটি বাদ পড়েছে বিষয়টি এমন নয়। ঠিকানা ভেরিফিকেশনে মেলেনি বলে আমরা তার নিয়োগ প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রেখেছি। তাদের নিজেদের বাড়ি নেই বলেই সমস্যা হয়েছে। এই ছেলের নামে জমির দলিলপত্রসহ অন্যন্য তথ্য জোগাড় করে অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। অধিদপ্তর তার বিষয়টি বিবেচনা করবে আশা করছি।’

Related Articles

Latest Posts