লটারি, বয়কট আর ফাঁকা মাঠে গোল: যেভাবে মিলেছে বিশ্বকাপের টিকিট

বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেওয়াটা যেকোনো জাতীয় দলের জন্যই এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই। বছরের পর বছর ধরে চলা বাছাইপর্ব, পয়েন্ট তালিকার হিসাবনিকাশ আর বুক ধড়ফড় করা সমীকরণ পেরিয়ে তবেই মেলে বিশ্বমঞ্চের টিকিট।

কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন কিছু রোমাঞ্চকর ও অদ্ভুত ঘটনার দেখা মেলে, যেখানে দলগুলো মূল পর্বে গেছে এক বিন্দু ঘাম না ঝরিয়ে কিংবা স্রেফ ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় কিংবা প্রতিপক্ষহীন ফাঁকা মাঠে গোল করে কিংবা নিয়মের মারপ্যাঁচে! ১৯৩৪ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এবারের ২০২৬ সালের আসর— বাছাইপর্বের এমন বিস্ময়কর কিছু অধ্যায় নিয়েই পাঠকদের জন্য এই আয়োজন।

বিনা যুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে

শুরুর দিকের বিশ্বকাপগুলোতে বাছাইপর্ব থেকে নাম প্রত্যাহারের হিড়িক ছিল। কখনো রাজনৈতিক কারণ, কখনো আয়োজক দেশ নিয়ে ক্ষোভ, আবার কখনো যাতায়াতের বিশাল খরচের ভয়ে দলগুলো সরে দাঁড়াত।

১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ থেকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই মূল আসরে জায়গা করে নেয় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। কারণ, ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ পেরু ও আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ চিলি বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ায়।

পরের আসরের স্বাগতিক ছিল ফ্রান্স। ইউরোপ মহাদেশে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রতিবাদে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশ বাছাইপর্ব বয়কট করে। সেই তালিকায় ছিল আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার মতো নাম। ফলে কোনো ম্যাচ না খেলেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট পেয়ে যায় কিউবা। একই আসরে এশিয়া মহাদেশ থেকে জাপান নাম প্রত্যাহার করায় বিনা লড়াইয়ে মূল পর্বে চলে যায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া)।

এই নাম প্রত্যাহারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। ইকুয়েডর, পেরু ও আর্জেন্টিনা সরে দাঁড়ানোয় কোনো ম্যাচ না খেলেই মূল পর্বে যায় উরুগুয়ে, বলিভিয়া ও চিলি। মজার ব্যাপার হলো, বাছাইপর্বে এক মিনিটের জন্যও মাঠে না নামা উরুগুয়েই সেবার মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল!

ওই আসরে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার), ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এশিয়া মহাদেশ থেকে ভারত সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। তবে দীর্ঘ যাত্রার ব্যয়ভার বহনে অনিচ্ছা এবং ১৯৫২ সালের অলিম্পিকে মনোযোগ দেওয়ার কারণে তারাও পরে সরে দাঁড়ায়। যদিও গুঞ্জন রয়েছে, খালি পায়ে খেলার ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞাই ছিল ভারতের অংশ না নেওয়ার মূল কারণ।

১৯৫৪ সালেও একই ধারা অব্যাহত থাকে। পোল্যান্ডের নাম প্রত্যাহারের কারণে বাছাইপর্বে নামা ছাড়াই সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে হাঙ্গেরি জায়গা করে নিয়েছিল।

১৪ বছরের বালকের হাতে তুরস্কের ভাগ্য

একই আসরের বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব জন্ম দিয়েছিল আরেক চমকপ্রদ ঘটনার। সেসময় ফিফার খামখেয়ালিপূর্ণ আয়োজনের কারণে ইউরোপ অঞ্চলের কিছু গ্রুপে কেবল দুটি করে দল রাখা হয়েছিল। তেমনই এক গ্রুপে পড়েছিল স্পেন ও তুরস্ক।

দুই দলই একটি করে ম্যাচে জয় পায়। প্রথম লেগে নিজেদের আঙিনায় স্পেন ৪-১ গোলে ও দ্বিতীয় লেগে ঘরের মাঠে তুরস্ক ১-০ গোলে জিতেছিল। বেশি গোল করার সুবাদে স্পেনেরই মূল পর্বে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখনও গোল ব্যবধানের নিয়ম চালু না হওয়ায় নিরপেক্ষ ভেন্যুতে প্লে-অফ ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ালেও দুই দলকে আলাদা করা যায়নি। ২-২ সমতায় শেষ হয় খেলা। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কে পাবে বিশ্বকাপের টিকিট। এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয় লুইজি ফ্রাঙ্কো জেমা নামের ১৪ বছর বয়সী এক ইতালিয়ান কিশোরকে, যার বাবা ওই স্টেডিয়ামেই কাজ করতেন।

চোখ বাঁধা অবস্থায় লুইজিকে একটি হ্যাট থেকে দুটি বলের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়। স্টেডিয়ামভর্তি দর্শকের সামনে তার হাতে ওঠে তুরস্কের নাম লেখা বলটি। ফলে স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে ছিটকে দিয়ে ভাগ্যের জোরে বিশ্বকাপে চলে যায় তুরস্ক!

রাজনৈতিক বয়কট, ফিফার নিয়মবদল ও ওয়েলসের রূপকথা

সুইডেনে হওয়া ১৯৫৮ সালের আসরে এসে ফিফা উপলব্ধি করে যে, বাছাইপর্বে কোনো ম্যাচ ছাড়াই বিশ্বকাপ খেলার এই প্রথা চলতে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে আফ্রিকা-এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বে মিশর, সুদান ও ইন্দোনেশিয়া যখন রাজনৈতিক কারণে ইসরায়েলের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন ফিফা কড়া নিয়ম করে— স্বাগতিক দেশ ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ছাড়া কোনো দল অন্তত একটি ম্যাচ না খেলে বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারবে না।

ইসরায়েলের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ইউরোপ অঞ্চলের বাছাইপর্বে রানার্সআপ হওয়া দলগুলোকে নিয়ে একটি লটারির আয়োজন করে ফিফা। সেখানে শুরুতে বেলজিয়ামের নাম উঠলেও তারা সরে দাঁড়ায়। তাই পরবর্তীতে ওয়েলসকে বেছে নেওয়া হয়।

দ্বিতীয়বার সুযোগ পেয়ে লুফে নিতে ভুল করেনি ওয়েলস। আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফের দুই লেগেই ইসরায়েলকে তারা হারায় ২-০ গোলে। ফলে অবিশ্বাস্য কায়দায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে দলটি।

সান্তিয়াগোর ভূতুড়ে ম্যাচ ও ফাঁকা পোস্টে গোল

পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ১৯৭৪ বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে মুখোমুখি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিলি। মস্কোতে প্রথম লেগের খেলা শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। তাই সমস্ত নজর ছিল সান্তিয়াগো হতে যাওয়া দ্বিতীয় লেগের দিকে।

তবে ১৯৭৩ সালের ২১ নভেম্বরের ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে এর পেছনের চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে, যা ফুটবল ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ভেন্যু ছিল ন্যাসিওনাল স্টেডিয়াম। কিন্তু এর মাত্র দুই মাস আগেই চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং অগাস্তো পিনোশের নতুন সরকার স্টেডিয়ামটিকে রাজনৈতিক বন্দিশিবির ও বিরোধীদের হত্যার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

এমন রক্তস্নাত একটি স্টেডিয়ামে খেলার বিষয়ে তীব্র আপত্তি জানায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা চিলির ভেতরেই অন্য কোনো ভেন্যুতে ম্যাচটি আয়োজনের জন্য ফিফাকে অনুরোধ করে। কিন্তু কোনো সমঝোতা না হওয়ায় সোভিয়েত দল শেষমেশ খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তাদেরকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী চিলিকে ওয়াকওভারের মাধ্যমে জয়ী ঘোষণা করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটি ঘটে ম্যাচের জন্য নির্ধারিত দিনে। কোনো প্রতিপক্ষ না থাকা সত্ত্বেও ফিফার নিয়ম মেনে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচটি আয়োজন করা হয়। চিলির খেলোয়াড়রা মাঠে নামেন এবং কিক-অফের পর বাধাহীনভাবে ফাঁকা পোস্টে বল জড়িয়ে জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। এরপর রেফারি বাঁশি বাজিয়ে খেলা শেষ করে দেন। ম্যাচটির স্থায়িত্ব ছিল ৩০ সেকেন্ডের মতো।

মূল বাছাইয়ে জয়হীন, তবু বিশ্বকাপে সুইডেন!

আগেকার দিনে যেখানে রাজনৈতিক বয়কট বা ফিফার সেকেলে নিয়ম অদ্ভুত সব পরিস্থিতির জন্ম দিত, আধুনিক ফুটবলে সেই জায়গা নিয়েছে ইউরোপ অঞ্চলের বাছাইপর্বের জটিল হিসাবনিকাশ। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও তাই নিয়মের মারপ্যাঁচ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মূল বাছাইপর্বে জয়হীন থেকেও সুইডেনের ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে পদার্পণ সেটারই প্রমাণ।

বাছাইপর্বের ‘বি’ গ্রুপে থাকা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি তাদের ছয়টি ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি। পয়েন্ট তালিকার একদম তলানিতে ছিল তাদের অবস্থান। কিন্তু স্বাভাবিক সমীকরণে বিদায় নেওয়ার কথা থাকলেও উয়েফা নেশন্স লিগের র‍্যাঙ্কিংয়ের সুবাদে দ্বিতীয় জীবন পায় তারা।

আর তা কাজে লাগিয়েই দীর্ঘ আট বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরছে সুইডেন। কোচ গ্রাহাম পটারের অধীনে প্লে-অফের সেমিফাইনালে ইউক্রেনকে সহজেই হারিয়ে দেয় তারা। তারপর ফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে মেলে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়। ম্যাচের ৮৮তম মিনিটে স্ট্রাইকার ভিক্টর ইয়োকেরেসের লক্ষ্যভেদ তৈরি করে দেয় ব্যবধান।
 

Related Articles

Latest Posts