গ্যালারির ভেতর তখন এক অদ্ভুত টানটান উত্তেজনা, যেন হাজারো মানুষের নিঃশ্বাস একসাথে আটকে আছে। মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর ছুটে বেড়ানো ২২টি শরীরের ভিড়ে হঠাৎ কেউ একজন আলাদা হয়ে ওঠার অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা যেন বহুদিনের, বহু যুগের। একটা মুহূর্তের জন্য, যে মুহূর্ত সবকিছু বদলে দেবে।
সেই মুহূর্তে বলটি এসে থামল এক তরুণের পায়ে। তখনও সে পুরোপুরি ‘তারকা’ নয়, বরং সম্ভাবনার এক দীপ্ত রেখা মাত্র। কিন্তু সম্ভাবনারও কখনও কখনও বিস্ফোরণ ঘটে, যে বিস্ফোরণে জন্ম নেয় ইতিহাস।
ফ্রান্সের সেই গ্রীষ্মে বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না, ছিল আবেগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর অতীতের হিসাব চুকানোর মঞ্চ। ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা, এই নাম দুটি উচ্চারণ করলেই ইতিহাসের পাতা যেন কেঁপে ওঠে। ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ছায়া, দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর সেই অবিশ্বাস্য সলো গোল, সবকিছু মিলিয়ে এই ম্যাচ যেন শুধু ফুটবল নয়, এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
ম্যাচটি হচ্ছিল স্তাদে জিওফ্রয়-গিচার্ড। ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন। গ্যালারির প্রতিটি কণ্ঠ যেন আগুনের মতো জ্বলছিল, আর সেই আগুনের মাঝেই ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল এক অনন্য নাটকের মঞ্চ।
খেলার সময় গড়াচ্ছিল, উত্তেজনা বাড়ছিল। ইংল্যান্ড তখন লড়ছে, আর্জেন্টিনাও সমান তালে পাল্টা আঘাত হানছে। ঠিক তখনই, মাঝমাঠে একটি বল, একটি মুহূর্ত, একটি সিদ্ধান্ত।
রবার্তো আয়ালা আর হোসে চামতের মতো অভিজ্ঞ সেনাপতিদের নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ তখন রীতিমতো চীনের মহাপ্রাচীর। সেই প্রাচীরে ফাটল ধরানো কোনো সাধারণ মরণশীলের কর্ম নয়। কিন্তু সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্যই ইংলিশ কোচ গ্লেন হডলের তূণে লুকানো ছিল আঠারো বছর বয়সী এক ব্রহ্মাস্ত্র। নাম মাইকেল ওয়েন।
ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ষোল মিনিট। স্নায়ুচাপের চরম মুহূর্তে দুই দলই একে অপরের শক্তি মাপছে। ঠিক সেই ক্ষণেই মাঝমাঠ থেকে পল ইন্স বলের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলেন ডেভিড বেকহামের পায়ে। বেকহামের জাদুকরী ডান পা থেকে হাওয়ায় ভেসে এল একটি নিখুঁত, জ্যামিতিক পাস।
মাঝমাঠ আর রক্ষণভাগের মাঝখানের সেই ফাঁকা জায়গায় বলটি যখন ওয়েনের ডান পায়ে এসে চুমু খেল, ঠিক তখনই যেন একটা সুইচ অন হয়ে গেল।
শুরু হলো দৌড়।
না, এটাকে শুধু দৌড় বলা অন্যায়। এটা ছিল এক বিদ্যুৎচমকের বিস্ফোরণ, যেখানে সময় যেন পিছিয়ে পড়ে, আর শরীর এগিয়ে যায় অবিশ্বাস্য গতিতে।
প্রথম স্পর্শেই বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটা ছিল শিল্পীর তুলির মতো মসৃণ, আর তারপরের দৌড়টা ছিল খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসা এক ক্ষুধার্ত চিতার মতো।
বল পায়ে তার গতি দেখে মনে হচ্ছিল, মাধ্যাকর্ষণ সূত্র যেন তার কাছে হার মেনেছে, বাতাসের বাধাকে সে অবলীলায় চিরে ফেলছে। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার হোসে চামতের মতো অভিজ্ঞ যোদ্ধা তার ছায়া ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করে ক্রমশ পিছিয়ে পড়লেন, যেন এক চলন্ত ট্রেনের সাথে পাল্লা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন কোনো ক্লান্ত পথিক।
এরপর সামনে পাহাড়ের মতো বাধা হয়ে এলেন খোদ রবার্তো আয়ালা। কিন্তু সেই আঠারো বছরের তরুণের চোখে তখন কোনো ভয় নেই, দ্বিধা নেই, আছে কেবল লক্ষ্যভেদের তীব্র এক আদিম বাসনা। শরীরটাকে সামান্য ডানদিকে হেলিয়ে, বলের ওপর অতিমানবিক নিয়ন্ত্রণ রেখে, জাদুকরী এক ডজ এবং বিদ্যুৎ গতিতে আয়ালাকেও খড়কুটোর মতো ছিটকে ফেললেন সেই কিশোর।
এবার সামনে শুধুই গোলরক্ষক কার্লোস রোয়া।
পুরো স্টেডিয়াম তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে, যেন একটা পিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। রোয়া নিজের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন, কোণ ছোট করে দিয়ে বিপদ সামাল দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা।
কিন্তু ওয়েন ততক্ষণে নিখুঁত এক ঘাতক, তার স্নায়ু তখন বরফের মতো শীতল।
ডান পায়ের নিঁখুত এক শট।
রোয়াকে ফাঁকি দিয়ে বল সোজা আছড়ে পড়ল জালের বাঁ-দিকের ওপরের কোণায়। জালের দুলুনির সাথে সাথে যেন প্রবল ভূমিকম্পে দুলে উঠল পুরো স্টেডিয়াম, দুলে উঠল ফুটবল বিশ্ব।
সেন্ট এতিয়েনের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তখন বইছে ইংলিশ সমর্থকদের উন্মাদনার প্রলয়ংকরী ঝড়। আর গোল উদযাপন করতে গিয়ে সেই কিশোর দুই হাত ঘষতে ঘষতে দৌড়াচ্ছে, চোখেমুখে অবিশ্বাসের হাসি। গাল দুটো আনন্দে লাল হয়ে উঠেছে, যেন এক অবোধ বালক ভুল করে কোনো জাদুর প্রদীপ ঘষে ফেলেছে!
সে নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, মাঝমাঠ থেকে শুরু করা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক জাদুকরী দৌড়ে সে ফুটবল ইতিহাসকে কতটা হতবাক করে দিয়েছে।
ম্যাচটি এগিয়ে গেল নিজের নাটকীয় পথে। ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড, উত্তেজনার বিস্ফোরণ, তারপর পেনাল্টি শুটআউটের নির্মম সমাপ্তি, ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত হেরে গেল।
কিন্তু কিছু পরাজয় থাকে, যা ইতিহাসে পরাজয় হিসেবে লেখা হয় না। সেই দিন, সেই ম্যাচে, ওয়েন জিতেছিলেন। তিনি জিতেছিলেন দর্শকের হৃদয়, জিতেছিলেন ফুটবল বিশ্বের বিস্ময়। তার সেই দৌড় হয়ে উঠেছিল এক প্রতীক। তারুণ্যের, গতি’র, আর নির্ভীকতার।

