যে দৌড় শেষ হয়নি আজও

পরাজিত মানুষের মুখে একটা বিশেষ নীরবতা থাকে। সেদিন ম্যাচ শেষে ইংরেজ ডিফেন্ডার টেরি বুচার লকার রুমে বসেছিলেন চুপ করে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। করার দরকারও ছিল না। যে মানুষটা তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে, সেই মানুষটাকে থামানো যায়নি, এই সত্যটা গায়ে মেখে বসে থাকা ছাড়া আর কী করার ছিল? পিটার রেইডও ছিলেন সেই লকার রুমে। পিটার শিলটনও। কেউ কারো দিকে তাকাননি।

সালটা ১৯৮৬। মেক্সিকো বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। কিন্তু এই ম্যাচকে শুধু কোয়ার্টার ফাইনাল বলাটা যেন অনেক কম বলা। চার বছর আগে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার অনেক ছেলেরা মারা গিয়েছিল। সেই রক্তের হিসাব কোনো শান্তিচুক্তিতে মেটে না, মেটাতে হয় ভিন্ন কায়দায়।

মাঠে আর্জেন্টিনার হয়ে সেই হিসাব মেটাতে নেমেছিলেন একজনই। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির এক মানুষ, যার পায়ে বল থাকলে পুরো স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখত। দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা।

৫১ মিনিটে একটা গোল হয়। হাত দিয়ে। ম্যারাডোনা পরে হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘একটু ঈশ্বরের হাতে, একটু ম্যারাডোনার মাথায়।’ তবে রেফারি গোল দিয়েছেন। ইংরেজরা প্রতিবাদ করেছে, ম্যারাডোনা ততক্ষণে দৌড়ে চলে গেছেন উদযাপনে।

সেই গোলের গল্প আগেই বলা হয়েছে। এর ঠিক চার মিনিট পরে যা ঘটে, সেটার জন্য কোনো বিতর্কের জায়গা নেই। সেটার জন্য কেবল নতজানু হওয়ার জায়গা আছে।

৫৫তম মিনিট। নিজেদের অর্ধে সতীর্থ হেক্টর এনরিকের কাছ থেকে একটা সাদামাটা পাস পেলেন ম্যারাডোনা। বলটা গড়িয়ে এল তার পায়ের কাছে। নিজেদের অর্ধে, সাইডলাইনের কাছাকাছি। ম্যারাডোনা বলটা নিলেন। এরপর দৌড়াতে শুরু করলেন।

বাঁধা দিতে প্রথমে এগিয়ে এলেন পিটার বেয়ার্ডসলি। ম্যারাডোনা হালকা একটি স্পর্শে তাঁকে পেছনে ফেলে দিলেন। তারপর পিটার রিড। ইংলিশ মিডফিল্ডার প্রাণপণ ছুটলেন, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা গেল তিনি এমন একজন মানুষকে তাড়া করছেন, যাকে ধরা সম্ভব নয়।

ম্যারাডোনা তখন গতি বাড়াচ্ছেন।

বলটি তার বাঁ পায়ের এত কাছাকাছি ছিল যে মনে হচ্ছিল, সেটি যেন তার শরীরেরই অংশ। অন্য খেলোয়াড়রা যেখানে দৌড়ানোর সময় বলকে সামনে ঠেলে দেয়, ম্যারাডোনা সেখানে বলটিকে নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপে বলটি তার নিয়ন্ত্রণে। এক ইঞ্চিও বেশি দূরে নয়।

ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল। সামনে টেরি ফেনউইক। অভিজ্ঞ, শক্তিশালী ডিফেন্ডার। কিন্তু ম্যারাডোনা শরীরের একটি ছোট্ট ভঙ্গিতে তাকে ভুল পথে পাঠিয়ে দিলেন। ফেনউইক পিছনে পড়ে গেলেন।

তারপর সামনে টেরি বুচার। ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার। তিনি পথ আটকাতে এলেন। কিন্তু ম্যারাডোনা এমন গতিতে দিক পরিবর্তন করলেন যে বুচার যেন এক মুহূর্তের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন।

সবকিছু ঘটছিল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। কিন্তু ভিডিওটি ধীর গতিতে দেখলে মনে হয় সময় থেমে গেছে। প্রতিটি ডিফেন্ডার যেন আলাদা একটি বাধা। আর ম্যারাডোনা একে একে সব বাধা ভেঙে এগিয়ে চলেছেন। মাঝমাঠ থেকে পেনাল্টি বক্স পর্যন্ত সেই যাত্রা দেখতে দেখতে মনে হয়, তিনি শুধু খেলোয়াড়দের কাটাচ্ছেন না; তিনি অসম্ভবকে কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এখন সামনে শুধু গোলরক্ষক পিটার শিলটন। ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। শিলটন বুঝতে পারছিলেন বিপদ আসছে। তিনি দ্রুত বেরিয়ে এলেন। গোলের কোণ ছোট করতে চাইলেন। বেশিরভাগ খেলোয়াড় সেখানে শট নিত।

কিন্তু ম্যারাডোনা ছিলেন অন্য গ্রহের।

তিনি শিলটনকে পাশ কাটিয়ে গেলেন এমন স্বাভাবিকভাবে, যেন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনো পথচারীকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এখন গোল প্রায় ফাঁকা। কিন্তু তখনও শেষ বিপদ বাকি। পেছন থেকে টেরি বুচার শেষবারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর পা ম্যারাডোনাকে ছুঁয়ে ফেলতে যাচ্ছিল।

আর এক সেকেন্ড দেরি হলে হয়তো ইতিহাস বদলে যেত। কিন্তু ম্যারাডোনা তার আগেই বাঁ পায়ে বলে শট নিয়ে ফেলেছেন।

নেট কাঁপল। মাঠ কাঁপল। সেই কম্পন থামেনি আজও।

মাঠে সেদিন পঁচিশ হাজার দর্শক ছিলেন। তারা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তটুকুর জন্য যখন বল জালে ঢোকার আগে বাতাসে ছিল। তারপর যে শব্দ উঠল, সেটা আর চিৎকার ছিল না। সেটা ছিল একটা সম্মিলিত স্বস্তির নিঃশ্বাস, যেন পুরো স্টেডিয়াম একসাথে বলছে, হ্যাঁ, এরকমই হওয়ার কথা ছিল।

ধারাভাষ্যে ভিক্টর হুগো মোরালেস তখন চিৎকার করে উঠেছিলেন, ‘
ব্যারিলেতে কসমিকা!’

বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘মহাজাগতিক ঘুড়ি!”’ 
এই একটি বাক্যই যেন পুরো গোলটির সবচেয়ে নিখুঁত বর্ণনা। কারণ ম্যারাডোনা সত্যিই সেদিন মানুষের মতো দৌড়াননি। তিনি যেন বাতাসে ভেসেছিলেন।

পরে হিসেব করা হয়েছে, ১০.৬ সেকেন্ড। মাত্র দশ দশমিক ছয় সেকেন্ডে ম্যারাডোনা ষাট গজেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছিলেন, পাঁচজন ইংরেজ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে, পাস না দিয়ে, একা।

পাস না দিয়ে। একা।

১৯৮৬-র বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ম্যারাডোনা হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা। কিন্তু সেই ট্রফির চেয়েও মানুষ মনে রেখেছে সেই দশ দশমিক ছয় সেকেন্ড।

কারণ ট্রফি ক্যাবিনেটে থাকে। কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে বুকের ভেতরে, যেখানে ধুলো পড়ে না, যেখানে সময় পৌঁছায় না।

সেই গোল এখন চল্লিশ বছর পুরনো। ম্যারাডোনা নিজেও আর নেই। ২০২০ সালে চলে গেছেন, বুয়েনোস আইরেসের কাছে একটা বাড়িতে, ঘুমের মধ্যে।

তবে সেই ষাট গজ যেন আজও শেষ হয়নি। ম্যারাডোনা যেন আজও দৌড়াচ্ছেন। বুচার আজও তাড়া করছেন। শিলটন আজও ঝাঁপ দিচ্ছেন। আর বলটা আজও জালে যাচ্ছে।

বারবার।

প্রতিবার।
 

Related Articles

Latest Posts