মেসি নেই, সামনে নতুন এক আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেই নতুন যাত্রায় দলের হাল কে ধরবেন, এখন সেটিই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। লিওনেল মেসির জাতীয় দল থেকে অবসরের পর আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে লিওনেল স্কালোনিকে ধরে রাখা। তবে নতুন চক্রের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে এখনো নিশ্চিত নন বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ।
আসন্ন ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতির জন্য আর্জেন্টিনার দল ঘোষণা নিয়ে অবশ্য কোনো দেরি হচ্ছে না। প্রথম ম্যাচের আগে এখনো ২০ দিনের বেশি সময় বাকি। স্কালোনি সাধারণত ম্যাচের প্রায় এক সপ্তাহ আগে দল ঘোষণা করেন। প্রতিপক্ষও এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। তাই এখনো দল ঘোষণা না হওয়া কিংবা সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের প্রাথমিক তালিকা ফাঁস না হওয়াকে কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার কারণ নেই।
আসল অনিশ্চয়তা স্কালোনিকে নিয়ে, ডিসেম্বরের পর তিনি থাকবেন কি না। তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ বছরের শেষেই শেষ হবে। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাকে ধরে রাখতে চাইলেও পরবর্তী চক্রের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি স্কালোনি। স্পেনের কাছে বিশ্বকাপের ফাইনালে ১-০ গোলে হারের পর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার চুক্তি পূরণ করব, এরপর দেখা যাবে।’
স্কালোনির সেই কথাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি যে চলে যাবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার থাকছেন, এমন ঘোষণাও আসেনি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য আশাবাদী। সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া স্কালোনিকে রাজি করানোর ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই মধ্যে প্রাথমিক যোগাযোগও হয়েছে বলে খবর। তবে স্কালোনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় নিতে চাইছেন।
অর্থ অবশ্য এই সিদ্ধান্তের পথে বাধা হওয়ার কথা নয়। খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের পাওনা নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে। বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট বোনাসও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিষয়টি আর্থিক নয়। প্রশ্ন একটাই—মেসিকে ছাড়া আরেকটি কঠিন চক্রের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতি ও ইচ্ছা স্কালোনির আছে কি না।
মেসির অবসরই এই সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ছাড়া দলকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। স্কালোনি জানেন, জাতীয় দলের কাঠামোয় মেসির জায়গাটা কতটা বড়। একই সঙ্গে বর্তমান দলটাকেও তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ চেনেন না। এরই মধ্যে একাধিক তরুণকে জাতীয় দলে সুযোগ দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ভিতও তৈরি করেছেন তিনি।
মেসির পর ক্রিস্তিয়ান রোমেরো অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া এনজো ফের্নান্দেস ও হুলিয়ান আলভারেসের মতো খেলোয়াড়দের ওপরও আগের চেয়ে বড় দায়িত্ব পড়বে। তবে চ্যালেঞ্জটা কোনো একজন খেলোয়াড়ের মধ্যে মেসির বিকল্প খোঁজা নয়। বরং দলীয় শক্তিকে সামনে রেখে নতুন আর্জেন্টিনা গড়ে তোলাই হবে মূল কাজ।
আর এই জায়গাটিই হয়তো স্কালোনির থাকার পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি। বর্তমান দলের শক্তি-দুর্বলতা তার ভালোভাবেই জানা। কঠিন পরিস্থিতিতে দল সামলানোর অভিজ্ঞতাও আছে তার। নতুন কোনো কোচ এলে তাঁকে শুরু থেকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, নিজের কৌশল প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং নতুন দলটাকেও বুঝে নিতে হবে।
তবে পরিবর্তন শুধু মাঠে নয়, কোচিং স্টাফেও আসছে। স্কালোনির দীর্ঘদিনের সহকারী ওয়াল্টার স্যামুয়েলও সিনিয়র জাতীয় দল ছেড়ে নিজের কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। ফলে পরবর্তী চক্রে স্কালোনিকে শুধু নতুন খেলোয়াড়দের নিয়েই নয়, নতুন কোচিং কাঠামো নিয়েও কাজ করতে হবে।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চাওয়া তাই পরিষ্কার, স্কালোনিকে রেখে তাকে নতুন দল গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ দেওয়া। কিন্তু স্কালোনির সিদ্ধান্তটা শুধু পেশাগত নয়, ব্যক্তিগতও।
বছরের পর বছর প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে প্রায় সবকিছুই অর্জন করেছেন তিনি। এখন মেসিকে ছাড়া আরেকটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রকল্পে আবারও একই চাপ নেওয়ার মতো ইচ্ছা তার আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

