চলতি মে মাসে মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অন্তত ৬৯টি ঘটনায় আরও ৭১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
আজ রোববার প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, ‘মে মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা (এপ্রিল মাসের) ২১ থেকে বেড়ে ৩২-এ এবং আহতের সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১-এ ঠেকেছে, যা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন।
গত এপ্রিল মাসে সারা দেশে মব হামলায় ২১ জন নিহত ও ৪৯ জন গুরুতর আহত হন। মার্চে নিহত হন ১৯ জন ও আহত হন ৩১ জন।
এমএসএফের হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জন, জানুয়ারিতে ২১ জন এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১০ জন মব হামলায় নিহত হন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একাধিকবার মব হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও এ ধরনের হামলায় হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
মব সহিংসতায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সংসদেও আলোচিত হয়েছে।
চলমান মব হামলার ঘটনার মধ্যে গত ১০ মে পুলিশ সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মব হামলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে সরকার বিদ্যমান আইন সংশোধন করবে অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করবে।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত মে মাসের প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, চলতি সময়ে মবের ঘটনা কমে না আসায় জনমনে নিরাপত্তা বোধের বিষয়টি প্রশ্নাতীতভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে ১৪ জন চুরির অভিযোগে, চারজন বাগবিতণ্ডার জেরে, দুজন ডাকাতির অভিযোগে, দুজন ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে, একজন হত্যার অভিযোগে, একজন অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে, একজন ছিনতাইয়ের অভিযোগে, একজন মাদক চোরাকারবারের অভিযোগে এবং ছয়জন অন্যান্য বিভিন্ন অভিযোগে মব হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।
এ ধরনের ঘটনায় আহতদের মধ্যে অন্তত ৩৫ জনকে পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপ্রিল ও মে মাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণে এমএসএফ বলেছে, ধর্ষণসহ নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা বৃদ্ধিও সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্তত ৩২৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ১২টি বেশি।
মে মাসে ৭০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা আগের মাসে ছিল ৫৪টি। সে হিসাবে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এছাড়া ১৬টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। এপ্রিল মাসে এমন ঘটনা ছিল দুটি।
এমএসএফের প্রতিবেদনে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর জন্য রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে। তবে নারী ও শিশু নির্যাতনের সব ঘটনায় নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে।
মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৯৩ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে নিহতের সংখ্যা ছিল তিনজন এবং আহত হন ৩০৩ জন।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে কারাগারে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আগের মাসে এ সংখ্যা ছিল ছয় এবং মার্চ মাসে ছিল ১১।
মানবাধিকার সংগঠনটি জানিয়েছে, মে মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন গুলিতে ও একজন নির্যাতনের ফলে মারা যান।
এ ছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এক জেলে ও এক অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। ফলে সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।
অন্যদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে পৃথক দুটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

