দেশের পোশাক ও জুতার খুচরা বিক্রেতারা এবার ঈদুল আজহার বাজার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের ব্যয়ের ধরণে পরিবর্তনের কারণে এ মৌসুমে বিক্রি আশানুরূপ হয়নি।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, এ বছর ঈদুল ফিতর, পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল আজহার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কম থাকায় অনেকেই নতুন পোশাক ও জুতা কেনাকে অগ্রাধিকার দেননি।
ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বিক্রেতারা তাদের প্রত্যাশিত বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহাকে ঘিরে সাধারণত উৎসবের আগের ১৫ দিন কেনাকাটার সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এবার সেই চিত্র দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সাদাকালোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজহারুল হক আজাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, গত এক দশকের মধ্যে এবারই ঈদুল আজহার সবচেয়ে দুর্বল বাজার দেখেছেন তারা।
তিনি বলেন, ক্রেতাদের ব্যয় করার আগ্রহে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
তার মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ ও মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। পাশাপাশি রাত ১০টার মধ্যে বাজার বন্ধের সিদ্ধান্তও কেনাকাটার অভ্যাসে প্রভাব ফেলেছে। এতে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেছে।
আজাদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে বিক্রি হয়েছে সাধারণ একটি ঈদুল আজহায় যে পরিমাণ বিক্রির আশা করা হয়, তার মাত্র ৪০ শতাংশের মতো।
মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও এপ্রিলেই তা আবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এপ্রিল মাসে বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে পৌঁছায়, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। এতে জ্বালানি, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৌমিক দাস বলেন, এবারের বিক্রি ছিল হতাশাজনক। ব্যবসায়ীরা মূলত গত বছরের দুর্বল বিক্রির সমপর্যায়ে থাকতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায় ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, বিক্রি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
তার মতে, সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি এখনো স্থবির। ঈদুল আজহাকে ঘিরে উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও প্রকৃত ক্রয়-ব্যয় কম থাকায় উদ্যোক্তাদের অনেকেই হতাশ হয়েছেন।
সৌমিক বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বড় একটি অংশ হয়তো কোরবানির পশুর পেছনে ব্যয়কেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আবার অনেকে অপ্রয়োজনীয় খরচের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হয়েছেন।
সাধারণত ঈদের মৌসুমে বাড়তি ভিড় সামাল দিতে খুচরা বিক্রেতাদের অতিরিক্ত অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। কিন্তু এবার সে ধরনের চাপ ছিল না বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।
সৌমিক আরও বলেন, রঙ বাংলাদেশ এ বছর অতিরিক্ত অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেয়নি। এমনকি সপ্তাহান্তেও অফিসের কর্মীদের বিক্রয়কেন্দ্রে সহায়তায় পাঠাতে হয়নি। কারণ ক্রেতার উপস্থিতি ছিল অফ-সিজনের স্বাভাবিক সময়ের কাছাকাছি।
কে ক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা খালিদ মাহমুদ খান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট ব্যবসায় ঈদুল আজহার বিক্রির ভাগ কমে গেছে। বাজারে টিকে থাকতে ব্যবসাগুলোকে ধারাবাহিক মূল্যছাড়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তার মতে, এসব অফার ক্রেতা টানতে কার্যকর হলেও ব্যবসার মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
খালিদ বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর পণ্যের বিক্রি কিছুটা বেশি হলেও অধিকাংশই বিক্রি হয়েছে তুলনামূলক কম দামে।
তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে বাজার সচল রাখা এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস ধরে রাখতে ব্যবসাগুলোকে খুব কম লাভে, এমনকি লাভ ছাড়াই পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে।’
একটি শীর্ষস্থানীয় জুতা কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র গরম ও ভারী বৃষ্টিপাত ক্রেতাদের চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ফলে বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেতা উপস্থিতিও কমে গেছে।
তিনি বলেন, ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরণেও পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বেশি দামের পণ্যের চাহিদা কমেছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রিমিয়াম ও নিম্নমূল্যের উভয় বাজারের ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এফইএবির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা আজহারুল হক আজাদ বলেন, খুচরা ব্যবসা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তার ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অপরাধ, দুর্ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং ভোক্তাদের আস্থাও কমিয়েছে।

