পৃথিবীর কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি আরও বাড়ল।
মার্কিন বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্কের বরাতে আজ মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, শত্রুর হামলা থেকে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে এই অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে ‘এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার’ সম্মেলনে মেইঙ্ক বলেন, ‘শুধু আকাশে নয়, মহাকাশেও আমাদের আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হুমকি মোকাবিলা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মহাকাশে সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়।’
The US has confirmed that it has deployed weapons in space, marking the first public acknowledgement of having such capabilities in orbit.
US Secretary of the Air Force, Troy Meink, said the weapons were necessary to counter hostile enemy action, without providing further… pic.twitter.com/elgo4QJW00
— Channel 4 News (@Channel4News) September 15, 2026
এ নিয়ে এক বিবৃতিতে মার্কিন স্পেস ফোর্স জানায়, গতিশীল ও গতিহীন-দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করার সক্ষমতা রয়েছে এ অস্ত্রের।
এসব সক্ষমতা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—উভয় উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
মহাকাশে কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, এর সংখ্যা কত, সক্ষমতা কী এবং কখন এটিকে কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি স্পেস ফোর্স।
এমনকি অস্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়েও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র।
এ ব্যাপারে মেইঙ্ক বলেন, ‘আমরা কী করছি তার কিছুই প্রকাশ করব না। কারণ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করলে তা প্রতিরোধ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, গতিশীল অস্ত্র যেমন ক্ষেপণাস্ত্র হলে তা সরাসরি আঘাত হানতে পারবে। অন্যদিকে গতিহীন অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে—স্যাটেলাইটের সেন্সর অকার্যকর করে দেওয়া লেজার, তথ্য আদান-প্রদানের লিংকে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বা সাইবার জ্যামিং বা সাইবার হামলা।
ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ শীর্ষ গবেষক ড. ব্লেডিন বোয়েন বিবিসিকে জানান, অনুমানের ভিত্তিতে তিনি ধারণা করছেন ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও জ্যামিং প্ল্যাটফর্মের কথা বলছে যুক্তরাষ্ট্র।
বোয়েন বলেন, ‘এ ধরনের অস্ত্র পৃথিবীতে আগে থেকেই রয়েছে। এগুলো রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।’
আরেকটি সম্ভাবনা হলো—‘কাইনেটিক কিল ভেহিকল’। এটি এমন একটি অস্ত্র, যা প্রজেক্টাইল ছুঁড়ে স্যাটেলাইটে সরাসরি আঘাত করে এবং সেটিকে ধ্বংস করতে পারে।
তবে এটি মোতায়েনের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করেন বোয়েন। তার মতে, এ ধরনের সরাসরি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করলে মহাকাশে বিপুল ধ্বংসাবশেষ তৈরি হতে পারে।
মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ, বিশেষ করে যোগাযোগ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত শত শত স্যাটেলাইটকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করে স্পেস ফোর্স।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রথম নতুন শাখা এটি।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে মার্কিন স্পেস ফোর্সের ভূমিকা শুধু মহাকাশে থাকা মার্কিন সম্পদ রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে আক্রমণাত্মক বাহিনী হিসেবেও এর সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মেইঙ্ক বলেন, মহাকাশ থেকে আসা হুমকি শনাক্ত ও ধ্বংসে সহায়তা করবে—এমন ব্যবস্থা আরও ব্যাপকভাবে মোতায়েনে কাজ করছে স্পেস ফোর্স।
এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করছে স্পেস ফোর্স।
এর আওতায় রয়েছে—স্পেস বেসড ইন্টারসেপ্টর (এসবিআই) এবং স্পেস বেসড এয়ার মুভিং টার্গেট ইন্ডিকেশন (এএমটিআই)।
স্পেস বেসড ইন্টারসেপ্টর সম্পর্কে মেইঙ্ক বলেন, ‘এক বছরেরও কম সময়ে এই কর্মসূচি প্রাথমিক চুক্তি থেকে উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত হার্ডওয়্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
২০২৮ সালের মধ্যে এটি শেষ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এএমটিআই তৈরি করতে মার্কিন বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্কের স্পেএক্সের সঙ্গে ইতোমধ্যে ৪২০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে স্পেস ফোর্স।
মেইঙ্ক বলেন, ওই কর্মসূচির প্রথম স্যাটেলাইট চলতি মাসেই উৎক্ষেপণ করা হবে।
তবে প্রাথমিকভাবে কতটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে বা শেষ পর্যন্ত পুরো কর্মসূচিতে কতটি স্যাটেলাইট থাকবে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি স্পেস ফোর্স।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে দুই প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—রাশিয়া ও চীন মূলত মহাকাশে মার্কিন স্বার্থের জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করছে।
স্পেস ফোর্স জানায়, প্রতিপক্ষের মহাকাশ সক্ষমতা মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করছে চীন।
অন্যদিকে রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে এবং মনে করে ভবিষ্যতে মহাকাশে আধিপত্যেই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মহাকাশে সামরিকীকরণ প্রথম থেকেই চলছে। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্পুটনিক প্রথম মহাকাশযান হিসেবে কক্ষপথে যাওয়ার পরপরই স্যাটেলাইটে অস্ত্র মোতায়েন নিয়ে কাজ শুরু করে ওয়াশিংটন ও মস্কো।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে জানা যায়, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউরোপের অন্তত ১০-১২টি স্যাটেলাইটের যোগাযোগে আড়ি পেতেছে রাশিয়া।
এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সব সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে রুশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে এসব স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, রাশিয়া এমন একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে যা অন্য স্যাটেলাইটে হামলা চালাতে সক্ষম। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি রাশিয়া।
২০১৯ সালের মার্চে ভারতও বলেছিল, তারা একটি নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে ওই অভিযান চালানো হয়। এর মধ্য দিয়ে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ভারতও বিশ্বের উন্নত মহাকাশ শক্তিগুলোর তালিকায় নিজের অবস্থান জানান দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর মহাকাশে ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতার’ বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে চীন।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
রাশিয়া বলেছে, মহাকাশকে অবশ্যই ‘সব ধরনের অস্ত্রমুক্ত’ রাখতে হবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘মহাকাশকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক ঐক্য গড়ে উঠবে বলে আমরা আশা করছি।’
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর কক্ষপথে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ প্রধান শক্তিগুলো ওই চুক্তির আওতার বাইরে রয়েছে। ফলে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করাসহ বিভিন্ন সক্ষমতা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমেছে এসব দেশ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো না থাকায় মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
একসময় মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল। তবে ১৯৬৭ সালে ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তির পর এই উদ্বেগ কিছুটা কমে আসে।
তবে অন্য অনেক উপায় নিয়ে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ বেশ কিছু দেশ।
মহাকাশ আইন বিশেষজ্ঞ লেতিতিয়া সেজারি এএফপিকে বলেন, ‘চুক্তিতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছু নেই। কারণ, সেসময় কেবল গণবিধ্বংসী ও পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘আগামী নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণবিষয়ক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’
সেজারি জানান, মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন ঠেকাতে একটি চুক্তি নিয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে কাজ করার চেষ্টা চালাচ্ছে মস্কো ও বেইজিং। অন্যদিকে মহাকাশে দায়িত্বশীল আচরণের ধারণা নিয়ে কাজ করছে পশ্চিমা দেশগুলো।
সেজারির মতে, ওয়াশিংটনের স্বীকারোক্তির পর মহাকাশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান আরও জোরালো করতে পারে মস্কো ও বেইজিং।
তবে হংকংভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক সং ঝংপিং মনে করেন, চীন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে না।
পৃথিবীর কক্ষপথে চীনেরও নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চীন এখন মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন করবে কি না, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোয় তার ওপর।’

